https://www.voiceofpeople24.com/

4982

international

হিমালয়ে হিমবাহ ধসের পর ভয়াবহ কাদাধস, মৃত প্রায় ৮০০, নিখোঁজ ৩ হাজারের বেশি

প্রকাশিত : ৩১ আগস্ট ২০২৬ ১১:২৩

হিমালয়ে হিমবাহ ধসে ভয়াবহ কাদাধসের পর নেপাল ও চীনে নিখোঁজ কয়েক হাজার মানুষকে উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে বৈরী আবহাওয়া, পাহাড়ি ভূখণ্ড ও নদ-নদীর পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়েছে।

দুই দেশের কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, রোববার পর্যন্ত এই দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৮০০ হয়েছে। এখনো নেপাল ও চীনের সীমান্তবর্তী দুই পাশে ৩ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।

গত বুধবার হিমালয়ের পাহাড়ি উপত্যকা ও নদীগুলো দিয়ে বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল স্রোত নেমে আসে। এতে বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়। আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা সংস্থা রেড ক্রসের হিসাবে, এই দুর্যোগে ৯০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারেন।

চীন জানিয়েছে, এই বিপর্যয়ের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের যোগসূত্র রয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই শনিবার নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, ওয়াং ই এই কাদাধসকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে দুই দেশের সবচেয়ে ভয়াবহ সীমান্তপারের দুর্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটিতে ৭৮১ জন নিহত এবং ২ হাজার ৫০২ জন নিখোঁজ রয়েছেন। অন্যদিকে চীনের গিরং কাউন্টিতে ১৬ জন নিহত ও ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন।

বেইজিং আরও জানিয়েছে, নেপালের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ একটি সীমান্ত পারাপার এলাকার কাছে তিব্বতে ২৩টি দেশের ২৬১ জন বিদেশি নাগরিকের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।

বন্যার আশঙ্কায় ব্যাহত উদ্ধারকাজ

দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ডের পাশাপাশি নতুন করে বৃষ্টিপাত উদ্ধার অভিযানকে আরও কঠিন করে তুলেছে। নেপালের স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, বৃষ্টির পর ত্রিশূলী নদীর পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দা ও উদ্ধারকর্মীদের উঁচু এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এতে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সীমান্ত এলাকায় সৃষ্ট একটি হ্রদ উপচে পড়ে বন্যা হতে পারে—এমন আশঙ্কায় কয়েক দফা উদ্ধার অভিযান স্থগিত করা হয়েছে। ওই হ্রদের পানি নেপালের লেন্দে খোলা ও ত্রিশূলী নদীতে প্রবাহিত হতে শুরু করেছিল।

চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, শনিবার সন্ধ্যার মধ্যে হ্রদটির পানি অনেকটাই কমে যায়। তবে পরে ড্রোনে দেখা যায়, হ্রদের প্রায় ২ দশমিক ৮ কিলোমিটার ভাটিতে নতুন একটি ভূমিধস হয়েছে। এতে সেখানে নতুন করে পানি জমতে শুরু করেছে।

জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে উদ্ধার তৎপরতা

নেপালে বর্তমানে বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়া পাঁচটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের দিকে উদ্ধার তৎপরতায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে আপার ত্রিশূলী কমপ্লেক্সে প্রায় ৩৫০ জন একটি টানেলের ভেতরে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

উদ্ধার অভিযানে নেপাল প্রায় ১০ হাজার সেনা মোতায়েন করেছে। তাদের সঙ্গে চীন ও ভারতের বিশেষজ্ঞ উদ্ধারকারী দলও কাজ করছে।

রোববার নেপালের সামরিক বাহিনী দুর্গম এলাকায় ভারী যন্ত্রপাতি আকাশপথে পৌঁছে দেয়। পরে উদ্ধারকারীরা একটি টানেলের প্রবেশমুখে পৌঁছে ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ শুরু করেন।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রবেশপথ নিরাপদ ও উন্মুক্ত করা সম্ভব হলে অক্সিজেন সরবরাহ এবং ক্যামেরা নিয়ে উদ্ধারকারী দল টানেলের ভেতরে প্রবেশ করবে।

নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রধান ধরম রাজ উপ্রেতি বলেন, বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষের কারণে উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। নিরাপত্তার কারণে বিস্ফোরণ ঘটিয়েও ধ্বংসাবশেষ সরানো যাচ্ছে না।

নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লোক বাহাদুর ছেত্রী জানান, টানেলের ভেতর উদ্ধার অভিযান, ডিএনএ পরীক্ষা, মরদেহ সংরক্ষণ এবং ফরেনসিক শনাক্তকরণে আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন।

পচতে থাকা মরদেহের গণকবর

এদিকে স্বজনদের খোঁজে হাসপাতাল, মর্গ ও ত্রাণকেন্দ্রে ঘুরছেন নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যরা। তবে উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাতপরিচয় শত শত মরদেহ পচতে শুরু করায় সেগুলো গণকবর দেওয়া শুরু করেছে নেপালের কর্তৃপক্ষ।

দুর্যোগকবলিত এলাকা থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে চিতওয়ান জেলার দেবঘাটের একটি জঙ্গলে এসব মরদেহ দাফন করা হচ্ছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রাসুয়া অঞ্চল থেকে পানির স্রোতে ভেসে আসা মরদেহও সেখানে নেওয়া হচ্ছে।

চিতওয়ানের প্রধান জেলা কর্মকর্তা গণেশ আরিয়াল বলেন, মরদেহ দ্রুত পচে যাওয়ায় জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। পরিস্থিতি বিবেচনায় গণকবর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শনিবার ৯৬টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ দাফন করা হয়েছে। রোববার আরও শতাধিক মরদেহ দাফনের পরিকল্পনা ছিল। পাশাপাশি উদ্ধারকারী দল নদী ও ধ্বংসাবশেষের মধ্য থেকে মরদেহ উদ্ধারের কাজও চালিয়ে যাচ্ছে।

ভবিষ্যতে স্বজনদের কাছে মরদেহ শনাক্ত করার সুযোগ রাখতে উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ এবং কবরের স্থানগুলো নথিবদ্ধ করা হচ্ছে।

নেপালের পুলিশ কর্মকর্তা অনিল থাপা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া মরদেহের অর্ধেকের বেশি শনাক্ত করার উপযোগী অবস্থায় নেই। অনেক মরদেহের মুখ বিকৃত হয়ে গেছে, আবার কোথাও শুধু শরীরের বিচ্ছিন্ন অংশ পাওয়া যাচ্ছে।