https://www.voiceofpeople24.com/
4944
international
প্রকাশিত : ২৫ আগস্ট ২০২৬ ১৩:৪৬
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বড় তিন দেশ জার্মানি, ফ্রান্স ও স্পেনেই এখন পর্যন্ত অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যা ২৫ হাজার ছাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আগস্টের পূর্ণাঙ্গ তথ্য যুক্ত হলে মৃত্যুর সংখ্যা আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
মে মাস থেকে পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে একের পর এক তাপপ্রবাহ আঘাত হানে। এ সময় শত শত আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার পুরোনো রেকর্ড ভেঙে যায়। ফ্রান্সে জাতীয় গড় হিসাবে সবচেয়ে উষ্ণ দিন রেকর্ড হয়েছে। জার্মানিতে জুনের শেষ দিকে টানা তিন দিন তাপমাত্রার রেকর্ড ভাঙে। দেশটির ৪৬টি আবহাওয়া কেন্দ্রে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়। স্পেনের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে ছিল।
বিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ছে। এর ফলে চরম তাপপ্রবাহের ঘটনা যেমন ঘন ঘন ঘটছে, তেমনি বাড়ছে এর তীব্রতাও।
এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি তাপজনিত মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে জার্মানিতে। দেশটির জনস্বাস্থ্য সংস্থা রবার্ট কখ ইনস্টিটিউটের (আরকেআই) হিসাবে, ৬ এপ্রিল থেকে ৯ আগস্ট পর্যন্ত আনুমানিক ১৪ হাজার মানুষ তাপের কারণে মারা গেছেন।
শুধু ২২ থেকে ২৮ জুন—এই এক সপ্তাহেই প্রায় ৯ হাজার ৬০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
২০০৮ সাল থেকে সংগৃহীত ইউরোপীয় ইউনিয়নের অতিরিক্ত মৃত্যুর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুলাইয়ের পর চলতি বছরের জুনের ওই সপ্তাহেই সবচেয়ে বেশি অতিরিক্ত মৃত্যুর হার দেখা গেছে। তবে ২০২২ সালে করোনাভাইরাস মহামারির প্রভাবও ছিল।
জার্মানিতে রেকর্ড সংরক্ষণ শুরুর পর ২০২৬ সালই তাপজনিত মৃত্যুর দিক থেকে সবচেয়ে ভয়াবহ বছর হতে যাচ্ছে। এর আগে সর্বোচ্চ ছিল ২০১৮ সালে, যখন প্রায় ৮ হাজার ৯০০ জন তাপজনিত কারণে মারা যান। সাধারণ গ্রীষ্মে দেশটিতে তাপজনিত মৃত্যু ২ হাজারের নিচে থাকে।
স্পেনের কার্লোস থ্রি হেলথ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, মে মাস থেকে চলতি সপ্তাহ পর্যন্ত দেশটিতে তাপের সঙ্গে সম্পর্কিত ৪ হাজার ৯৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর ফলে ২০২৬ সাল দেশটির ইতিহাসে তাপজনিত মৃত্যুর সবচেয়ে ভয়াবহ বছর হয়ে উঠেছে।
এর আগে ২০২২ সালে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৫২০ জনের তাপজনিত মৃত্যুর হিসাব পাওয়া গিয়েছিল।
তবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তাপজনিত মৃত্যুর হিসাবের পদ্ধতি এক নয়। স্পেন ও জার্মানিতে মডেল ব্যবহার করে তাৎক্ষণিকভাবে মৃত্যুর সংখ্যা অনুমান করা হয়। দৈনিক তাপমাত্রার সঙ্গে মৃত্যুহারের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে এ হিসাব তৈরি করা হয়।
কারণ, মৃত্যুসনদে খুব কম ক্ষেত্রেই সরাসরি ‘তাপ’কে মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অতিরিক্ত গরম অনেক সময় হৃদ্রোগ, শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা বা কিডনি রোগের মতো আগে থেকে থাকা অসুস্থতাকে আরও জটিল করে তোলে। ফলে শেষ পর্যন্ত হৃদ্রোগ, স্ট্রোক বা কিডনি বিকল হয়ে মৃত্যু হতে পারে।
ফ্রান্সে ৫০০টির বেশি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়। এক পর্যায়ে দেশটির ৯৮ শতাংশ এলাকা তাপপ্রবাহের সতর্কতার আওতায় ছিল।
দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, মে মাসের শেষ দিক থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল প্রায় ৭ হাজার ৩০০। তবে এ হিসাবের সঙ্গে আগস্টের তথ্য যুক্ত হয়নি। পাশাপাশি প্রাথমিক হিসাবটি ইলেকট্রনিক মৃত্যুসনদের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে, যা ফ্রান্সের মোট মৃত্যুর প্রায় ৮০ শতাংশের তথ্য ধারণ করে।
ইতালিতে এখনো পূর্ণাঙ্গ জাতীয় মৃত্যুর হিসাব প্রকাশ হয়নি। মডেলভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ২২ থেকে ২৮ জুনের মধ্যে দেশটিতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় ২ হাজার ৭০০ জন বেশি মারা গেছেন।
মহামারিবিদদের ধারণা, আনুষ্ঠানিক হিসাব সম্পন্ন হলে ইতালিতে তাপজনিত মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৫ হাজার থেকে ৮ হাজারের মধ্যে হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা সংস্থা জানিয়েছে, মে ও জুনের তাপপ্রবাহে ইংল্যান্ডে মডেলভিত্তিক হিসাবে ২ হাজার ৮৭৭ জনের তাপ-সম্পর্কিত মৃত্যু হয়েছে।
বেলজিয়ামে ১৮ থেকে ২৯ জুনের মধ্যে মৃত্যুহার ৩৯ শতাংশ বেড়েছিল। ওই সময়ে স্বাভাবিকের তুলনায় অতিরিক্ত ১ হাজার ২২২ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটি। নেদারল্যান্ডসেও ২২ জুন থেকে ৫ জুলাইয়ের মধ্যে অন্তত ৯০০ অতিরিক্ত মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া পোল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ, গ্রিস, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া ও ডেনমার্কেও তাপপ্রবাহের সময়ে অতিরিক্ত মৃত্যুর প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির হিসাবে, চলতি গ্রীষ্মে ইউরোপের যেসব এলাকায় ৮ কোটির বেশি মানুষ বসবাস করেন, সেখানে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে উঠেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, গত দুই দশকে ইউরোপীয় অঞ্চলে তাপজনিত মৃত্যুহার ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে এই ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকায় তীব্র তাপপ্রবাহের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়বে। চলতি গ্রীষ্মের চার দফা রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহ পরিস্থিতির ভয়াবহতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন পর্যন্ত পাওয়া ৩৫ হাজারের বেশি অতিরিক্ত মৃত্যুর হিসাবও চূড়ান্ত নয়; আগস্টের পূর্ণাঙ্গ তথ্য ও পরবর্তী স্বাস্থ্য বিশ্লেষণ শেষে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে।