https://www.voiceofpeople24.com/
4822
national
জাতীয়
প্রকাশিত : ০৮ আগস্ট ২০২৬ ১১:১৭
বাগেরহাটের রামপালে দ্বিতীয় ইউনিট হিসেবে প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিবর্তে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অব্যবহৃত ব্লক-বির প্রায় ৬৮৫ একর জমিতে ৪৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতার গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)।
প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা। পরিকল্পনা কমিশনের পর্যালোচনার পর ব্যয় কমিয়ে ২ হাজার ৫০২ কোটি টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদও আট মাস কমিয়ে ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, আমদানিনির্ভর কয়লা-গ্যাস-তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করাই প্রকল্পটির প্রধান উদ্দেশ্য। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের জ্বালানি মিশ্রণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য পূরণেও প্রকল্পটি ভূমিকা রাখবে।
অব্যবহৃত জমিতে সৌরবিদ্যুৎরামপালে বর্তমানে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রয়েছে। এর পাশের ৯১৮ দশমিক ৫ একর ব্লক-বিতে একই ক্ষমতার আরেকটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। তবে দীর্ঘদিন ধরে জমিটি অব্যবহৃত থাকার পর সেখানে এখন সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী, পুরো জমি সৌরকেন্দ্রের জন্য ব্যবহার করা হবে না। সবুজ বেষ্টনী, বন্যা প্রতিরোধ বাঁধ, জলাধার ও নিম্নভূমি সংরক্ষণসহ বিভিন্ন ব্যবহারের পর প্রায় ৬৮৫ একর জমিতে সৌর প্যানেল স্থাপন করা হবে।
উৎপাদিত বিদ্যুৎ ২৩০ কেভি সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানির (বিআইএফপিসিএল) উপকেন্দরে সরবরাহ করা হবে। এ জন্য নতুন ২৩০ কেভি বে-এক্সটেনশন নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ম তামিমের মতে, দ্বিতীয় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিবর্তে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নেওয়া ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। এতে নতুন করে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না এবং আগে নির্মিত বাঁধ, ভূমি উন্নয়ন ও অন্যান্য অবকাঠামো ব্যবহার করা সম্ভব হবে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় ও ব্যয় দুটোই কমতে পারে।
২,৫০২ কোটি টাকার প্রকল্পপরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় প্রকল্পটি পর্যালোচনার পর ব্যয় কমানোর সুপারিশ করা হয়। ৩ আগস্ট অনুষ্ঠিত সভায় কয়েকটি শর্ত সাপেক্ষে প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদনের জন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে পিডিবির নিজস্ব তহবিল থেকে ৩৭৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা এবং বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন তহবিল থেকে ২ হাজার ১২৭ কোটি টাকা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ যাবে সৌর ফটোভোল্টেইক (পিভি) মডিউল স্থাপনে। এ খাতে প্রায় ৯২৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। গ্রিড-টাইড ইনভার্টার, ট্রান্সফরমার, সাবস্টেশন, কেবল ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কিনতে ব্যয় হবে প্রায় ৭৩৫ কোটি টাকা।
এ ছাড়া অবকাঠামো নির্মাণে ১৯৩ কোটি টাকা, ভবন ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণে ৪৩ কোটি টাকা এবং ২৩০ কেভি সঞ্চালন লাইন ও বে-এক্সটেনশনে প্রায় ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে।
পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে কমিশনের সতর্কতাসৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প হওয়ায় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের তুলনায় পরিবেশগত চাপ কমার সম্ভাবনা থাকলেও প্রকল্প এলাকা সুন্দরবন ও পশুর নদসংলগ্ন হওয়ায় পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে পরিকল্পনা কমিশন।
কমিশনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, প্রকল্পের ডিপিপিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত প্রভাব, সৌর প্যানেল ও অন্যান্য সরঞ্জামের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি যথেষ্ট বিস্তারিতভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি।
বিশেষ করে অতিরিক্ত লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং বিষাক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মানদণ্ড অনুসরণ করে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণের সুপারিশ করেছে কমিশন।
পাশাপাশি জমির বহুমুখী ব্যবহারের জন্য খাল সংস্কার, বনায়ন এবং হাঁস-মুরগি পালনের মতো কার্যক্রম চালুর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যে নতুন পদক্ষেপদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বর্তমানে তুলনামূলকভাবে কম। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে এই অংশ ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সৌরবিদ্যুৎকে অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
রামপালের দ্বিতীয় ইউনিটকে কয়লার পরিবর্তে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে রূপান্তর সেই নীতিরই একটি বাস্তব প্রয়োগ। সরকারের আশা, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে একদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়বে, অন্যদিকে কয়লা আমদানির ওপর নির্ভরতা ও কার্বন নিঃসরণ কমাতে সহায়তা করবে।
তবে প্রকল্পটি সুন্দরবনের কাছাকাছি হওয়ায় পরিবেশগত ঝুঁকি যথাযথভাবে মূল্যায়ন ও ব্যবস্থাপনা করেই এটি বাস্তবায়ন করা হবে—এটাই এখন পরিকল্পনা কমিশনের অন্যতম প্রধান শর্ত।