https://www.voiceofpeople24.com/
4681
international
প্রকাশিত : ২০ জুলাই ২০২৬ ১১:১২
গাজা পুনর্গঠনের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা থেকে অনেকটাই সরে এসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’। পুরো গাজা পুনর্নির্মাণের পরিবর্তে এখন সংস্থাটি সীমিত পরিসরে রাফাহর কাছে একটি পরীক্ষামূলক অস্থায়ী আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান–এর বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন পরিকল্পনার আওতায় যুদ্ধবিরতির রেখা-সংলগ্ন বাফার জোনে বহনযোগ্য কেবিন দিয়ে একটি অস্থায়ী শিবির গড়ে তোলা হবে। এর প্রশাসনিক দায়িত্ব থাকবে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ), বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত ফিলিস্তিনি পুলিশ এবং একটি ছোট আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর।
এই পরিকল্পনা ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের জানুয়ারিতে উপস্থাপিত ‘ফ্রি মার্কেট গাজা’ পরিকল্পনার তুলনায় অনেক ছোট পরিসরের। সে সময় ১০০ দিনের মধ্যে গাজার মৌলিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বর্তমান পরিকল্পনায় তার খুব সামান্য অংশই টিকে আছে।
এর আগে ২০২৫ সালের গাজা শান্তি পরিকল্পনায় জাতিসংঘের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত বহুজাতিক শান্তিরক্ষা বাহিনী ‘ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স’ (আইএসএফ) গঠনের কথা বলা হয়েছিল। এই বাহিনীর তত্ত্বাবধানে পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা থাকলেও পরিকল্পনাটি এখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
তবে ইসরায়েল-গাজা সীমান্তের কেরেম শালোম ক্রসিংয়ে আইএসএফের একটি লজিস্টিক ঘাঁটির নির্মাণকাজ প্রায় শেষ হয়েছে। বাহিনীর সদস্যদের মিশরে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে মরক্কো, কসোভো এবং সম্ভাব্যভাবে আলবেনিয়া ও কাজাখস্তানের সেনারা অংশ নিতে পারেন। তবে তাদের মোতায়েনের আগে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন এবং ইসরায়েলের সঙ্গে আইনি কাঠামো চূড়ান্ত করতে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
দুই সপ্তাহ আগে সাইপ্রাসে বোর্ড অব পিস, ট্রাম্প প্রশাসন, টনি ব্লেয়ার ইনস্টিটিউট এবং গাজার প্রশাসনের জন্য জাতীয় কমিটির প্রতিনিধিদের বৈঠকে এই পাইলট প্রকল্পের রূপরেখা চূড়ান্ত হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইসরায়েলি সেনারা যুদ্ধবিরতির রেখা থেকে সরে গেলে আইএসএফ এবং প্রশিক্ষিত ফিলিস্তিনি পুলিশ যৌথভাবে শিবিরটির নিরাপত্তা ও তদারকি করবে।
তবে প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থায়ন। ট্রাম্পের ঘোষিত ২০ দফা গাজা শান্তি পরিকল্পনার জন্য প্রতিশ্রুত প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলারের সামান্য অংশই এখন পর্যন্ত পাওয়া গেছে। অর্থসংকট কাটাতে বোর্ড অব পিস ফিলিস্তিনের কর রাজস্বের প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার এবং ইসরায়েলের জব্দ করা কিছু ব্যাংক সম্পদ ব্যবহারের চেষ্টা করছে। এ উদ্যোগের বিরোধিতা করেছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনের আগে গাজায় বড় ধরনের নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কম। নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী জোট ক্ষমতা হারাতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।
তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করছেন, নির্বাচনের ফল যাই হোক, হামাস নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত গাজায় সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকতে পারে। অন্যদিকে হামাস জানিয়েছে, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে তারা অস্ত্র সমর্পণের বিষয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত। গত সপ্তাহে কায়রোয় অনুষ্ঠিত বৈঠকেও সংগঠনটি অংশ নেয়।
কায়রোর আলোচনায় হামাসের সম্ভাব্য নিরস্ত্রীকরণ, আত্মসমর্পণ করা অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ এবং কোন ধরনের অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়ার আওতায় আসবে—এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
তবে কায়রো থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল যতদিন গাজায় বিমান হামলা অব্যাহত রাখবে, ততদিন হামাসের নিরস্ত্রীকরণের সম্ভাবনা খুবই সীমিত থাকবে।
এদিকে সাইপ্রাস বৈঠক সম্পর্কে অবগত এক কর্মকর্তার বরাতে দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, রাফাহভিত্তিক এই পাইলট প্রকল্প নিয়ে গাজার প্রশাসনের জন্য জাতীয় কমিটির মধ্যেও মতভেদ রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে গাজার ২১ লাখ বাসিন্দার মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি হতে পারে এবং অধিকাংশ ফিলিস্তিনি মানবিক সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে আরও পিছিয়ে পড়তে পারেন।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে এখন পর্যন্ত ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, গণহত্যাবিষয়ক গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যার শামিল বলে অভিহিত করেছেন। এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) দক্ষিণ আফ্রিকার করা মামলার বিচার চলমান রয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্তের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। একই আদালত ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় কথিত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে হামাসের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধেও পরোয়ানা জারি করেছিল, যদিও পরবর্তীতে তারা ইসরায়েলি অভিযানে নিহত হন।