https://www.voiceofpeople24.com/
4857
economy
অর্থনীতি
প্রকাশিত : ১১ আগস্ট ২০২৬ ১১:০৪
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সফরকালে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা সরকারি বিভিন্ন সংস্থা এবং ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এসব আলোচনায় সম্ভাবনাময় খাত, বিনিয়োগের সুযোগ এবং বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা নেওয়া হবে।
তবে এখন পর্যন্ত প্রতিনিধিদলের কোনো প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট বিনিয়োগের পরিমাণ বা প্রকল্প ঘোষণার কথা জানায়নি। তাই সফরটিকে আপাতত সরাসরি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাব্য ক্ষেত্র চিহ্নিত করার প্রাথমিক উদ্যোগ হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র অবশ্য জানিয়েছে, সফর শেষে বিনিয়োগের বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিনিধিদলের সদস্যরা রোববার ও সোমবার ঢাকায় পৌঁছেছেন। মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিডার সঙ্গে বৈঠকের মধ্য দিয়ে তাঁদের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা। এরপর সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে বৈঠক করবেন তাঁরা।
আলোচনায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, বঙ্গোপসাগরে অফশোর তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি, হাই-টেক পার্ক, ফিনটেক, ব্যাংক-বিমা, অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিল্প, লজিস্টিকস ও সেবা খাত গুরুত্ব পেতে পারে।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে এসেছে। তাঁদের দেশের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ সম্পর্কে অবহিত করা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিনের ভাষ্য, মার্কিন ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের এই সফর বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ।
প্রতিনিধিদলের আগ্রহের তালিকায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় বিনিয়োগের সম্ভাবনা যাচাই করবেন মার্কিন ব্যবসায়ীরা।
এর মধ্যে বঙ্গোপসাগরে অফশোর তেল-গ্যাস অনুসন্ধানকে বড় সম্ভাবনার ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকার সম্প্রতি ২৬টি অফশোর ব্লকে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে। এতে গ্যাসের মূল্য নির্ধারণে ব্রেন্টের দামের সঙ্গে সংযোগ, মুনাফা দেশে ফেরত নেওয়ার সুযোগ এবং বিভিন্ন কর-সুবিধাসহ প্রণোদনা রাখা হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে যুক্ত মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলোর জন্য অফশোর অনুসন্ধান নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং জ্বালানি অবকাঠামোতেও বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে।
এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক বলেন, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের জন্য অনেক খাত রয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তায় বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি তুলনামূলক কম জ্বালানি প্রয়োজন এমন খাতগুলোও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরার পরামর্শ দেন তিনি।
জ্বালানির পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও মার্কিন কোম্পানিগুলোর আগ্রহ রয়েছে। হাই-টেক পার্ক, সফটওয়্যার, ডেটা সেন্টার, ডিজিটাল অবকাঠামো ও ই-কমার্সে বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
দ্রুত সম্প্রসারিত ডিজিটাল লেনদেন, ডেটা প্রসেসিং ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার কারণে বাংলাদেশে এ খাতে বাজার বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফিনটেক, ডিজিটাল পেমেন্ট, পেমেন্ট গেটওয়ে ও ডেটাভিত্তিক আর্থিক সেবাও বিনিয়োগের সম্ভাব্য ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অবকাঠামো খাতেও রয়েছে বড় সুযোগ। সমুদ্রবন্দর, অভ্যন্তরীণ লজিস্টিকস, পরিবহনব্যবস্থা, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্প পার্কে বিনিয়োগ এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। বন্দর ও কাস্টমসের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং পণ্য পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়নও গুরুত্ব পেতে পারে।
বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগের উপস্থিতি দীর্ঘদিনের। সিটিব্যাংক ও মেটলাইফসহ বেশ কয়েকটি মার্কিন প্রতিষ্ঠান দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক সেবায় প্রযুক্তিনির্ভর নতুন বিনিয়োগের সুযোগও রয়েছে।
দেশে মার্কিন পুঞ্জীভূত বিনিয়োগ ৪০০ কোটি ডলারের বেশি হলেও এর উল্লেখযোগ্য অংশ এসেছে আগে থেকে কার্যরত মার্কিন কোম্পানিগুলোর পুনর্বিনিয়োগের মাধ্যমে। ফলে নতুন মার্কিন বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট করাকে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের সফরকে শুধু বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ হিসেবে দেখলে হবে না। কোন খাতে কতটা বিনিয়োগ প্রয়োজন, কী ধরনের প্রকল্প অগ্রাধিকার পাবে এবং বিনিয়োগকারীদের কী ধরনের সুবিধা দেওয়া হবে—এসব বিষয়ে বাংলাদেশের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ এলে কোন খাতে তা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা জরুরি। বিশেষ করে জ্বালানি অবকাঠামোয় মার্কিন বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করা যেতে পারে। তাঁর মতে, শুধু বিদেশি ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে আনলেই হবে না; তাঁদের জন্য সুস্পষ্ট নীতি, নীতির ধারাবাহিকতা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান বলেন, মার্কিন বিনিয়োগ বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হবে। তবে বিনিয়োগের পুরো প্রক্রিয়া স্বচ্ছ এবং জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাশার তুলনায় কম। তাই এই সফরকে সম্ভাবনাময় খাত, প্রয়োজনীয় প্রকল্প এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা নির্ধারণে একটি কার্যকর সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানো উচিত।