https://www.voiceofpeople24.com/
4764
politics
রাজনীতি
প্রকাশিত : ০১ আগস্ট ২০২৬ ১৩:৫০
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন থেকেই জন্ম নিয়েছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন (বৈছাআ)। অল্প সময়ের মধ্যেই এই প্ল্যাটফর্ম ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের কেন্দ্রীয় শক্তিতে পরিণত হয়। ৩৬ দিনের টানা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দাবিকে গণআন্দোলনে রূপ দেয় সংগঠনটি। তবে অভ্যুত্থানের মাত্র এক বছরের মাথায় সেই সংগঠনই এখন কার্যত নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে।
২০১৮ সালে সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল করা হলেও ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট সেই সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করলে নতুন করে কোটা বহালের সম্ভাবনা তৈরি হয়। এর প্রতিবাদে ১ জুলাই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ ব্যানারে রাজপথে নামেন। তাদের দাবি ছিল, নিয়োগে কোটার পরিবর্তে মেধা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিতে হবে।
ক্রমেই আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ, সমাবেশসহ নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে সংগঠনটি সাধারণ মানুষেরও সমর্থন পেতে শুরু করে।
আন্দোলন দমনে সরকারের কঠোর অবস্থানের ফলে সংঘর্ষে বহু শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ এবং শিশুসহ অসংখ্য ব্যক্তি হতাহত হন। পরিস্থিতি সামাল দিতে কারফিউ, সেনা মোতায়েন ও ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের মতো পদক্ষেপ নেয় সরকার।
১৯ জুলাই আন্দোলনের সমন্বয়কেরা ৯ দফা দাবি ঘোষণা করেন। পরে আন্দোলনের গতি আরও তীব্র হয়। জুলাইয়ের শেষ দিকে কয়েকজন সমন্বয়ককে গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হলে তাঁদের দিয়ে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে বাইরে থাকা নেতৃত্ব সেই ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলন চালিয়ে যায়।
৩ আগস্ট সরকার পতনের এক দফা দাবির ঘোষণা আসে। মাত্র দুই দিনের মধ্যেই ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন থাকলেও আন্দোলনের সাংগঠনিক নেতৃত্ব ও সমন্বয়ের মূল কৃতিত্ব ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের।
সরকার পরিবর্তনের পরই সংগঠনটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, প্রভাব বিস্তার, অনিয়ম ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের অভিযোগ উঠতে শুরু করে। এর প্রভাব পড়ে সাংগঠনিক কার্যক্রমেও।
২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃত্বের বড় অংশকে নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। ফলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি হয় এবং সংগঠনটি দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে।
একই বছরের ২৫ জুন নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হলেও অভিযোগ ও বিতর্ক থামেনি। পরে গত বছরের ২৭ জুলাই কেন্দ্রীয় কমিটি ছাড়া দেশের সব কমিটির কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল কেন্দ্রীয় কমিটিও স্থগিত করা হলে পরদিনই সভাপতি রিফাত রশিদ, মুখ্য সমন্বয়ক হাসিব আল ইসলামসহ কয়েকজন নেতা এনসিপিতে যোগ দেন।
কেন্দ্রীয় কমিটি স্থগিতের পর পাঁচ সদস্যের একটি উপদেষ্টা পর্ষদকে ৩০ দিনের মধ্যে সংগঠন পুনর্গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হলেও কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও নতুন কমিটি গঠন হয়নি। উপদেষ্টা পর্ষদের সদস্যদের মধ্যেও মতবিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। একাংশ বর্তমান কাঠামো সমর্থন করলেও অন্য অংশ সেটি প্রত্যাখ্যান করেছে।
এদিকে রাজধানীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের যে কার্যালয় ছিল, সেটিও আর তাদের দখলে নেই। বর্তমানে সংগঠনটির কোনো স্থায়ী কার্যালয়ও নেই বলে জানা গেছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন কর্মসূচি পালন করলেও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য কোনো কর্মসূচি দেখা যায়নি। সংগঠনের সাবেক অনেক নেতাই মনে করছেন, নানা বিতর্ক, নেতৃত্ব সংকট ও সাংগঠনিক দুর্বলতায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের আস্থা হারিয়েছে প্ল্যাটফর্মটি।
আন্দোলনের প্রথম দিকের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদের বলেন, অভ্যুত্থানের পর শহীদ পরিবার, আহতদের পুনর্বাসন এবং আন্দোলনের চেতনা ধরে রাখতে সংগঠনটির সক্রিয় ভূমিকা রাখার প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। তাঁর ভাষায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এখন কার্যত বিলুপ্ত অবস্থায় রয়েছে।
অন্যদিকে সর্বশেষ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রিফাত রশিদ বলেন, তিনি এখন সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। তাই বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে মন্তব্য করার দায়িত্ব বর্তমান নেতৃত্বের।