https://www.voiceofpeople24.com/

4935

sylhet

সিলেট

প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ সড়কের অর্ধেকের বেশি গাছ কাটা

প্রকাশিত : ২৪ আগস্ট ২০২৬ ১০:৪৫

 

পরিবেশকর্মী ও স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ (সাচনা বাজার) সড়কের গাছ কাটা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিল জেলা প্রশাসন। তবে সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করে গত ১৫ দিনে সড়কটির অর্ধেকের বেশি গাছ কেটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বন বিভাগের বিরুদ্ধে। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীরা।

জেলা প্রশাসনের দাবি, তাদের অবহিত না করেই গাছ কাটা হয়েছে। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জ-সাচনা বাজার সড়কে প্রায় ৪ হাজার ৪০০টি গাছ রয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলার অংশের গাছ ২৮ লাখ ৩৬ হাজার টাকা এবং জামালগঞ্জ অংশের গাছ ৫৬ লাখ ৪৪ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। অর্থাৎ মোট ৮৪ লাখ ৮০ হাজার টাকায় গাছগুলো বিক্রি হয়েছে। সে হিসাবে প্রতিটি গাছের গড় মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৯২৭ টাকা।

বন বিভাগের তালিকাভুক্ত টাঙ্গাইলের দুটি, সিলেটের একটি এবং দোয়ারাবাজারের একটি—মোট চারটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে গাছ কাটার কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে।

সামাজিক বনায়ন বিধিমালা অনুযায়ী, গাছ বিক্রির অর্থের ৫৫ শতাংশ উপকারভোগী, ১০ শতাংশ বন অধিদপ্তর, ২০ শতাংশ সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) এবং ৫ শতাংশ ইউনিয়ন পরিষদ পাবে। বাকি অর্থ দিয়ে পুনরায় বনায়ন করার কথা রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েক কোটি টাকা মূল্যের গাছ নামমাত্র দামে বিক্রি করে বন বিভাগের সংশ্লিষ্টরা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। গাছের প্রকৃত বাজারমূল্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ সড়কের দুই পাশে রেইনট্রি, কড়ই, আকাশি, অর্জুন, মেরাসহ ফলদ, বনজ ও ঔষধি প্রজাতির অন্তত ১০ ধরনের গাছ রয়েছে। প্রায় ২০ থেকে ২৫ বছর আগে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় এসব গাছ লাগানো হয়েছিল। স্থানীয়দের পরিচর্যায় সময়ের সঙ্গে সড়কটি সবুজে ঘেরা হয়ে ওঠে।

সরেজমিনে সড়কের বিভিন্ন স্থানে কাটা গাছের বড় বড় টুকরা পড়ে থাকতে দেখা গেছে। কোথাও কোথাও শ্রমিকদের গাছ কাটতেও দেখা যায়। অধিকাংশ গাছ কেটে নেওয়ায় সড়কের অনেক অংশ এখন ফাঁকা হয়ে গেছে। এতে পাখির আবাসস্থল ও মানুষের ছায়ার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

সদর উপজেলার ইচ্ছারচর গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম বলেন, গাছ কাটার বিষয়ে স্থানীয়দের কিছু জানানো হয়নি। প্রতিবাদ করেও গাছ কাটা বন্ধ করা যায়নি। তাঁর ভাষ্য, গাছগুলো এলাকার পরিবেশ ও প্রকৃতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

সুনামগঞ্জের আব্দুজ জহুর সেতু থেকে জামালগঞ্জের সাচনা বাজার পর্যন্ত সড়কটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৯ কিলোমিটার। এ সড়কের বিভিন্ন অংশে অন্তত সাড়ে চার হাজার গাছ রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

গৌরারং ইউনিয়নের জগন্নাথপুর গ্রামের আতাউর রহমান অভিযোগ করেন, সামাজিক বনায়নের অংশ হিসেবে গাছ লাগানোর সময় স্থানীয়দের ৫৫ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। তাঁর দাবি, বর্তমানে গাছগুলো বাজারমূল্যের তুলনায় কম দামে বিক্রি করা হয়েছে।

এর আগে ২০২৪ সালের মার্চেও সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ সড়কের গাছ কাটার উদ্যোগ নিয়েছিল বন বিভাগ। তখন প্রতিটি গাছের বাকল কেটে লাল কালিতে নম্বর দেওয়া হয়েছিল এবং দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ ও স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে সে উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সুনামগঞ্জের সভাপতি তৈয়বুর রহমান বাবুল বলেন, সুনামগঞ্জ-সাচনা বাজার সড়কটি জেলার অন্যতম সুন্দর সড়ক। হাওরাঞ্চলে এমনিতেই বন-জঙ্গল কমে যাচ্ছে। এর মধ্যে সড়কের গাছ কেটে ফেলা পরিবেশের জন্য বড় ক্ষতি। কাটা হয়নি এমন গাছগুলো রক্ষা এবং কাটা জায়গায় নতুন করে গাছ লাগানোর দাবি জানান তিনি।

তবে বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, দরপত্রের মাধ্যমে গাছগুলো বিক্রি করা হয়েছে। সামাজিক বনায়নের মেয়াদ শেষ হওয়ায় অনেক গাছ পরিপক্ব হয়ে মারা যাচ্ছিল। এ কারণে গাছ কাটার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে উপকারভোগীরাও লভ্যাংশ পাবেন বলে জানান তিনি।

অন্যদিকে, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মতিউর রহমান খান জানিয়েছেন, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত গাছ কাটা বন্ধ থাকবে এবং ইতিমধ্যে কাটা গাছ বন বিভাগের হেফাজতে থাকবে।

তিনি আরও বলেন, এ ধরনের গাছ কাটার আগে জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কমিটিকে অবহিত করার নিয়ম থাকলেও বন বিভাগের পক্ষ থেকে তাদের এ বিষয়ে জানানো হয়নি। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে।