https://www.voiceofpeople24.com/
4751
economy
অর্থনীতি
প্রকাশিত : ৩০ জুলাই ২০২৬ ১৭:২৬
নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আগামী কয়েক সপ্তাহে রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়বে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা এবং লাখো শ্রমিকের জীবিকা—সবকিছুর ওপরই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
শিল্পমালিকদের তথ্য অনুযায়ী, গ্যাস-সংকটের দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও আগামী ৮ আগস্টের আগে সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। ফলে প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। আগে থেকেই অনেক টেক্সটাইল ও পোশাক কারখানা ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছিল। নতুন সংকটে উৎপাদন আরও কমে গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নিটিং, ডাইং, ওয়াশিং, কম্প্যাক্টিং ও ফিনিশিং ইউনিট, যেখানে নিরবচ্ছিন্ন ও নির্দিষ্ট চাপের গ্যাস অপরিহার্য।
কারখানা মালিকরা বলছেন, সংকট এখন শুধু উৎপাদন কমে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; পুরো উৎপাদন পরিকল্পনাই অনিশ্চয়তায় পড়েছে। কখন গ্যাস থাকবে আর কখন থাকবে না—এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। ফলে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী উৎপাদন শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক কারখানায় রাতের দিকে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লে তখন উৎপাদনের চেষ্টা করা হচ্ছে, এতে শ্রমঘণ্টা, বিদ্যুৎ ব্যবহার ও পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী আগামী ৮ আগস্টের আগে গ্যাস পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এতে মাসের প্রায় তিন সপ্তাহ উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে উঠবে। তাঁর আশঙ্কা, এ পরিস্থিতিতে প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত রপ্তানি আয় কমে যেতে পারে। পাশাপাশি অনেক কারখানার শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধেও চাপ সৃষ্টি হবে।
বর্তমান সংকটের মূল কারণ কক্সবাজারের মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালের কার্যক্রম বন্ধ থাকা। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে এলএনজি থেকে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এতে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট থেকে কমে ২১৫ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে। অথচ দেশের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে রয়েছে গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, টঙ্গী ও চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চল। টেক্সটাইল খাতের তথ্য অনুযায়ী, অনেক কারখানায় প্রয়োজনীয় ১০ থেকে ১৫ পিএসআই গ্যাসচাপের পরিবর্তে মাত্র ১ দশমিক ৫ থেকে ৩ পিএসআই চাপ পাওয়া যাচ্ছে। এত কম চাপে ডাইং ও প্রসেসিং ইউনিট স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না।
সংকট মোকাবিলায় অনেক কারখানা সিএনজি স্টেশন থেকে সিলিন্ডারের মাধ্যমে গ্যাস এনে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছিল। তবে নিরাপত্তা ও বিধিমালার বিষয়টি উল্লেখ করে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ সেই ব্যবস্থাও বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে উৎপাদন সচল রাখার শেষ বিকল্পটিও কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বিকল্প এই সরবরাহ চালু রাখার দাবি জানিয়েছে, যাতে অন্তত কিছু রপ্তানি আদেশ নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন করা যায়।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এখন কম খরচে উৎপাদনের চেয়ে সময়মতো পণ্য সরবরাহ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত সময় মেনে পণ্য পাঠাতে ব্যর্থ হলে বিদেশি ক্রেতারা সহজেই ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভারত বা ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়েন। এতে তাৎক্ষণিক আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের প্রতি ক্রেতাদের আস্থাও কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এদিকে নির্ধারিত সময় রক্ষা করতে অনেক রপ্তানিকারক ব্যয়বহুল এয়ার শিপমেন্ট ব্যবহারের কথাও ভাবছেন। এতে পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। শিল্পমালিকদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে এয়ার শিপমেন্টে প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত খরচ হতে পারে, যা সরাসরি রপ্তানিকারকদের মুনাফায় প্রভাব ফেলবে।
উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব ইতোমধ্যে শ্রমবাজারেও পড়তে শুরু করেছে। অনেক কারখানায় ওভারটাইম কমানো হয়েছে, নতুন নিয়োগ স্থগিত রয়েছে। কিন্তু উৎপাদন কমলেও শ্রমিকদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল, ব্যাংকঋণের কিস্তি, কারখানা ভাড়া ও অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় বহন করতে হওয়ায় মালিকদের আর্থিক চাপ বাড়ছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশের মোট পণ্য রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। তাই এই খাতে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস-সংকটের প্রভাব শুধু শিল্পকারখানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পুরো অর্থনীতিতেই এর নেতিবাচক প্রতিফলন দেখা দেবে। তাঁর মতে, এই পরিস্থিতি আবারও প্রমাণ করেছে যে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে উৎপাদন সক্ষমতার পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।