https://www.voiceofpeople24.com/
4679
national
জাতীয়
প্রকাশিত : ২০ জুলাই ২০২৬ ১১:০৫
দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে দিতে নীতিগতভাবে সম্মতি দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দুবাই পুলিশ। তবে প্রত্যর্পণের আগে চারটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে ইন্টারপোলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দুবাই পুলিশের এই পদক্ষেপকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাদের বক্তব্য, বেনজীরকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি নেই; তবে কোন আইনি কাঠামো ও প্রক্রিয়ায় তাঁকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রায় পাঁচ দিন আগে দুবাই পুলিশের ওই চিঠি বাংলাদেশে পৌঁছেছে। বর্তমানে পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের ইন্টারপোল শাখার সহযোগিতায় চাওয়া তথ্য ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত করছে দুদক।
বেনজীর আহমেদের মামলার তদন্ত ও প্রত্যর্পণসংক্রান্ত কার্যক্রম সমন্বয় করছেন দুদকের উপপরিচালক হাফিজুল ইসলাম। তিনি বলেন, চিঠি পাওয়ার পর থেকেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুতের কাজ শুরু হয়েছে। দ্রুত জবাব পাঠানো গেলে বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া আরও এগিয়ে যাবে বলে আশা করছেন তিনি।
গত ১৪ জুন জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ প্রথম জানান, দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত বেনজীর আহমেদকে দুবাইয়ে আটক করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। তিনি বলেন, ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) আবুধাবি থেকে পাঠানো এক ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার এ তথ্য জানতে পারে।
এরপর ইন্টারপোলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বেনজীরের প্রত্যর্পণ চায় বাংলাদেশ। দুদক প্রায় ১৪৪ পৃষ্ঠার নথি আরবি ভাষায় অনুবাদ করে কূটনৈতিক মাধ্যমে দুবাইয়ে পাঠায়। এতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, মামলার বিবরণ এবং প্রত্যর্পণের জন্য প্রয়োজনীয় সব আইনি নথি সংযুক্ত করা হয়। প্রায় এক মাস পর সেই আবেদনের জবাব দিয়েছে দুবাই পুলিশ। বর্তমানে বেনজীর দুবাইয়ের একটি কারাগারে আটক রয়েছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, দুবাই পুলিশ মূলত চারটি বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছে। প্রথমত, বাংলাদেশ কোন আইনের অধীনে এবং কী প্রক্রিয়ায় বেনজীরকে ফেরত নিতে চায়। দ্বিতীয়ত, দুই দেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকায় এ ক্ষেত্রে আইনি ভিত্তি কী। তৃতীয়ত, আদালতের জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আন্তর্জাতিক কার্যকারিতা কতটুকু। চতুর্থত, পুরো প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় আইন মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তে কেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, আন্তর্জাতিক প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় এ ধরনের ব্যাখ্যা চাওয়া স্বাভাবিক বিষয়। প্রয়োজনীয় তথ্য পাঠানো হলে বেনজীরকে বাংলাদেশে হস্তান্তরের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তাঁদের দাবি, দুবাই পুলিশের চিঠির ভাষা থেকেই বোঝা যায়, তারা প্রত্যর্পণের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বেনজীর আহমেদ ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক এবং পরে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২১ সালে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে তাঁর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। পরে ২০২৪ সালে অবৈধ সম্পদ অর্জন, দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে দুদক। আদালতের নির্দেশে তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের বিপুল সম্পদ জব্দ করা হয়। তদন্ত চলাকালে ২০২৪ সালের ৪ মে তিনি পরিবারসহ দেশ ছেড়ে যান।
পরবর্তীতে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের হয় এবং আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল দুদকের আবেদনের ভিত্তিতে ইন্টারপোল তাঁর বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করে। বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচার ও জালিয়াতিসহ ছয়টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, দুবাইয়ে বেনজীরকে গ্রেপ্তারের পেছনে তাঁর কয়েকজন সাবেক সহযোগীর দেওয়া তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ব্যবসায়িক ও আর্থিক বিরোধের জেরে তাঁরা দুবাই পুলিশকে তথ্য দেন। পরে একটি শপিং মল থেকে তাঁকে আটক করা হয়। এ ক্ষেত্রে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাও দুবাই পুলিশের বিবেচনায় ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।