https://www.voiceofpeople24.com/
5029
sylhet
সুনামগঞ্জ
প্রকাশিত : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:৫৬
সরকার নির্ধারিত দামে গুদামে ধান বিক্রি করতে নানা জটিলতা থাকায় অনেকে সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রমের বাইরে রয়েছেন। অন্যদিকে খোলাবাজারেও ক্রেতা কম। ফলে দেনা পরিশোধ ও সংসারের প্রয়োজন মেটাতে বাধ্য হয়ে কম দামে ফড়িয়াদের কাছে ধান বিক্রি করছেন তাঁরা।
দিরাই উপজেলার উদগল হাওরপারের ধনপুর গ্রামের কৃষক রাজা মিয়া বলেন, গত বোরো মৌসুমে খেত ডুবে ও ধান পচে যাওয়ায় আশানুরূপ ফলন হয়নি। ২১ কিয়ার জমি চাষ করে তিনি প্রায় ৮০ মণ ধান পেয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, ধানের দাম কমার পাশাপাশি ধান কেনার মতো লোকও পাওয়া যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, ভালো মানের ধানের সর্বোচ্চ দাম মণপ্রতি ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা। অপেক্ষাকৃত দুর্বল ধান ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মণ দরে হাঁসের খামারিদের কাছে বিক্রি করছেন অনেকে।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উৎপাদন খরচের নিচে নেমে গেলেও অনেকে ধান বিক্রি করতে পারছেন না। সরকারি গুদামে নির্ধারিত দামে ধান বিক্রি করতে নানা হয়রানি ও জটিলতার কারণে অনেক কৃষক সেখানে যেতে আগ্রহী নন।
এক ফসলি এলাকা হিসেবে পরিচিত সুনামগঞ্জে বোরো ধানই অধিকাংশ মানুষের প্রধান আয়ের উৎস। কৃষকদের ভাষ্য, ধান বিক্রির অর্থ দিয়ে পরিবারের বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠান, সন্তানদের লেখাপড়া, চিকিৎসা, পোশাক ও পরবর্তী কৃষিকাজসহ সারা বছরের নানা খরচ মেটানো হয়।
গত বোরো মৌসুমে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে হাওরের অনেক জমি তলিয়ে যাওয়ায় আগেই ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন কৃষকেরা। এবার উৎপাদন কমার পাশাপাশি ধান বিক্রি করতে না পারায় তাঁদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত মৌসুমে সুনামগঞ্জের ছোট-বড় ১৯৩টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়। প্রায় ১৪ লাখ টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ধান উৎপাদন হয়েছে ১২ লাখ ৯৮ হাজার ৪০০ টন।
জেলায় বোরোচাষির সংখ্যা প্রায় চার লাখ। এর মধ্যে কার্ডধারী কৃষক ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৭ জন এবং ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক ২ লাখ ২৩ হাজার ৮০৭ জন।
সুনামগঞ্জের ধান কেনাবেচার অন্যতম প্রধান ও প্রসিদ্ধ বাজার মধ্যনগর। প্রতিবছর এ সময়ে কৃষক ও ব্যাপারীদের আনাগোনায় সরগরম থাকলেও এবার বাজারে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র।
গত ২৯ আগস্ট সাপ্তাহিক হাটের দিনে মধ্যনগর বাজারে গিয়ে দেখা যায়, ধানের আড়তগুলোতে তেমন ব্যস্ততা নেই। আড়তদারদের অনেককেই অলস সময় কাটাতে দেখা যায়।
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, গত বছরগুলোতে এ সময়ে প্রতিটি আড়তে প্রতিদিন ৮০০ থেকে ১ হাজার ১০০ মণ পর্যন্ত ধান কেনাবেচা হতো। আশপাশের হাওরাঞ্চল থেকে কৃষকেরা নৌকা ও বিভিন্ন যানবাহনে ধান নিয়ে বাজারে আসতেন। কিন্তু এবার ব্যাপারীদের আনাগোনা কমে যাওয়ায় বাজারে ধানও কম আসছে।
মধ্যনগর বাজারে ছোট-বড় অর্ধশতাধিক ধানের আড়ত থাকলেও সেগুলোতে কৃষক-শ্রমিকের ব্যস্ততা চোখে পড়ছে না।
তমা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী জসীম উদ্দিন বলেন, ধানের বাজার খুবই মন্দা। অপেক্ষাকৃত দুর্বল ধান মণপ্রতি ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা এবং ভালো মানের ধান ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ১৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
তিনি বলেন, আগে তাঁর আড়তে প্রতিদিন ৭০০ থেকে ৮০০ মণ ধান কেনা হলেও এবার তা কমে ১৫০ থেকে ২০০ মণে নেমেছে। ধান কেনার পর তাঁরা আশুগঞ্জের ব্যাপারীদের কাছে বিক্রি করেন। কিন্তু অর্থসংকটের কারণে ব্যাপারীরাও এবার বাজারে কম আসছেন।
মধ্যনগর বাজারে কান্দাপাড়া গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে কথা হয়। তিনি ২৬ কিয়ার জমিতে বোরো আবাদ করে প্রায় ৫০০ মণ ধান পেয়েছেন। তাঁর হিসাবে, প্রতি মণ ধানের উৎপাদন খরচ পড়েছে প্রায় ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা।
কিন্তু ধান বিক্রি করেছেন মাত্র ৯০০ টাকা মণ দরে। তিনি বলেন, ৯০০ টাকা দরে বাকিতে একটি হাঁসের খামারের মালিকের কাছে ৬০ মণ ধান বিক্রি করেছেন। এতে চাষাবাদের খরচও উঠছে না।
জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘ধান কেনার মতো মানুষ নাই। কৃষকের অবস্থা খুব খারাপ।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের ধান ক্রেতা প্রতিষ্ঠান মীম আছিয়া ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী ইকবাল হোসেন বলেন, তাঁরা কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনে চাল উৎপাদন করে বাজারজাত করেন। কিন্তু বর্তমানে ধানের দাম ও চালের দামের মধ্যে সামঞ্জস্য নেই। ফলে ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়ছেন।
তিনি বলেন, শুধু ধান কিনলেই হবে না, সেই ধান বিক্রিও করতে হবে। লোকসানের আশঙ্কায় তাঁরাও আগের তুলনায় কম পরিমাণে ধান কিনছেন।
সুনামগঞ্জ খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর জেলায় মণপ্রতি ১ হাজার ৪৪০ টাকা দরে প্রায় ২১ হাজার টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে সংগ্রহ হয়েছে ১ হাজার টনেরও কম।
সুনামগঞ্জের ভারপ্রাপ্ত খাদ্য নিয়ন্ত্রক ফেরদৌস জাহান বলেন, দেশব্যাপী নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ধান সংগ্রহ হওয়ায় খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ধান সংগ্রহ কার্যক্রম শেষ করা হয়েছে।
ফলে সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর খোলাবাজারে ধানের ক্রেতাসংকট এবং কম দামের কারণে হাওরের কৃষকদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।