https://www.voiceofpeople24.com/

4517

religious-news

কেপ ভার্দেতে মুসলমানদের জীবনযাপন কেমন?

প্রকাশিত : ১৬ জুন ২০২৬ ১৮:১৭

কেপ ভার্দের মোট জনসংখ্যার মাত্র এক শতাংশ মুসলিম। ২০২১ সালের জাতীয় আদমশুমারি অনুযায়ী, প্রায় ৫ লাখ ৫ হাজার মানুষের এই দ্বীপদেশে মুসলিমের সংখ্যা আনুমানিক পাঁচ হাজার। তাদের অধিকাংশই সেনেগাল, গিনি-বিসাউ ও মালির মতো পশ্চিম আফ্রিকার দেশ থেকে আসা অভিবাসী। রাজধানী প্রাইয়া এবং সাও ভিসেন্তে দ্বীপের মিনদেলো শহরকে কেন্দ্র করেই তাদের বসবাস বেশি। সুন্নি মতাদর্শ অনুসরণকারী এসব মুসলিম মূলত ক্ষুদ্র ব্যবসা ও সেবা খাতে কাজ করে স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।

যেভাবে কেপ ভার্দেতে ইসলামের আগমন

১৪৬২ সালে পর্তুগিজরা কেপ ভার্দেতে উপনিবেশ স্থাপন শুরু করলে আটলান্টিক দাস-বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে সান্তিয়াগো দ্বীপ। সেই সময় সেনেগাম্বিয়া ও আপার গিনি অঞ্চল থেকে আগত মুসলিম ব্যবসায়ী এবং ক্রীতদাসদের মাধ্যমে দ্বীপপুঞ্জটিতে ইসলামের পরিচয় ঘটে।

ওলোফ, মানদিলকা ও ফুলানি জনগোষ্ঠীর মুসলমানরা আখখেত ও গৃহস্থালির শ্রমে নিয়োজিত ছিলেন। ইতিহাসবিদদের মতে, পশ্চিম আফ্রিকার মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল থেকে আনা বহু ক্রীতদাস ইসলামী জ্ঞান ও সংস্কৃতির ধারক ছিলেন।

তবে ঔপনিবেশিক শাসনামলে পর্তুগিজ কর্তৃপক্ষ ক্যাথলিক খ্রিষ্টধর্মের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। মুসলিম ক্রীতদাসদের জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা হতো এবং প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত, মসজিদ নির্মাণ কিংবা ধর্মীয় আচার পালনের ওপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ১৫৯৪ থেকে ১৬২৫ সালের পর্তুগিজ বিবরণীতেও স্থানীয় মুসলিম প্রচারকদের রাজনৈতিক হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল।

তবুও সব প্রতিকূলতার মধ্যেও ওলোফ ও মানদিলকা ভাষার কিছু শব্দ কেপ ভার্দিয়ান ক্রেওল সংস্কৃতিতে জায়গা করে নেয়, যা ইসলামের সেই প্রাচীন উপস্থিতির নীরব সাক্ষ্য বহন করে। তবে ঔপনিবেশিক যুগে কোনো স্থায়ী ইসলামি প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারেনি।

স্বাধীনতার পর নতুন পথচলা

১৯৭৫ সালের ৫ জুলাই পর্তুগালের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পর কেপ ভার্দের সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়। ফলে দীর্ঘদিনের বাধা কাটিয়ে মুসলমানরা প্রকাশ্যে ধর্মীয় অনুশীলনের সুযোগ পান।

১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে পর্যটনশিল্পের বিকাশ এবং বাণিজ্য উদারীকরণের কারণে পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে মুসলিম অভিবাসীদের আগমন বাড়তে থাকে। ১৯৯০ সালে রাজধানী প্রাইয়ায় নির্মিত হয় দেশের প্রথম আনুষ্ঠানিক মসজিদ, যা মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

পরবর্তীতে ২০১৪ সালের এক আইনের মাধ্যমে অন্তত ৫০০ সদস্যবিশিষ্ট ধর্মীয় সংগঠনগুলো আইনি স্বীকৃতি ও করছাড়ের সুবিধা লাভের সুযোগ পায়। মুসলিম সংগঠনগুলোও এই সুবিধার আওতায় আসে। একই সময়ে সাল ও বোয়া ভিস্তার মতো পর্যটননির্ভর দ্বীপগুলোতে সেনেগালিজ মুসলিম ব্যবসায়ীরা নিজেদের বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করেন।

সীমিত হলেও বাড়ছে ইবাদতের সুযোগ

কেপ ভার্দেতে মুসলমানদের ধর্মীয় অবকাঠামো এখনো তুলনামূলক সীমিত। সাল দ্বীপে বর্তমানে তিনটি ছোট ইবাদতখানা রয়েছে—দুটি সান্তা মারিয়ায় এবং একটি এস্পারগোসে। এসব স্থানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, জুমা, তারাবি ও ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়।

২০২৫ সালের মে মাসে স্থানীয় ইসলামি অ্যাসোসিয়েশন ক্রমবর্ধমান মুসলিম জনসংখ্যার প্রয়োজন মেটাতে একটি কেন্দ্রীয় মসজিদ নির্মাণের জন্য সরকারের কাছে জমি বরাদ্দের আবেদন জানিয়েছে।

অন্যদিকে রাজধানী প্রাইয়ায় ইমাম আহমাদু নেকা থিয়ানের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় মসজিদ ও একটি বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ১৭টি দেশের সহায়তায় তহবিল গঠন করা হলেও ভূমি-সংক্রান্ত জটিলতায় প্রকল্পটির বাস্তবায়ন এখনো অপেক্ষমাণ।

অধিকার রক্ষায় সংগঠিত মুসলিম সমাজ

কেপ ভার্দের মুসলিমদের প্রধান সংগঠন ‘কম্যুনিদাদে ইসলামিকা দে কাবো ভের্দে’। তবে ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে এটি সব অঞ্চলের মুসলিমদের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না।

এই প্রেক্ষাপটে ২০২২ সালের শেষ দিকে গঠিত হয় ‘অ্যাসোসিয়েশন ইসলামিকা দে দাওয়াহ দে কাবো ভের্দে’। ১১ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদ পরিচালিত এই সংগঠন ইসলামি দাওয়াহ, নতুন মুসলিমদের সহায়তা, জাকাত বিতরণ এবং খাদ্যসামগ্রী প্রদানসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে।

সংগঠনটির উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বদের মধ্যে রয়েছেন গিনি-বিসাউয়ের নাগরিক ও সৌদি আরব থেকে ইসলামি থিওলজিতে ডিগ্রিপ্রাপ্ত ইমাম ইবরাইমা সিদি এবং মুয়াজ্জিন সেকু সুয়ারে। কেপ ভার্দের মুসলিম সমাজের ধর্মীয় চর্চায় আজও সেনেগালের সুফি ঐতিহ্যের গভীর প্রভাব লক্ষ করা যায়।

সংখ্যায় ক্ষুদ্র হলেও কেপ ভার্দের মুসলমানরা নিজেদের ধর্মীয় পরিচয়, সামাজিক সংহতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রেখে ধীরে ধীরে দেশের বহুত্ববাদী সমাজের একটি স্বীকৃত অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছেন।