https://www.voiceofpeople24.com/

4889

national

তিন দশকে মশা মারার খরচ: ধোঁয়া ছড়াতেই ১৮০০ কোটি

প্রকাশিত : ১৮ আগস্ট ২০২৬ ১০:২৬

দেশজুড়ে ডেঙ্গুর বিস্তার থাকলেও রাজধানী ঢাকায় এর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ৭০ জনের মধ্যে ৩২ জনই ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার বাসিন্দা। কীটতত্ত্ববিদদের আশঙ্কা, আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে সেপ্টেম্বরজুড়ে ঢাকায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে।

মশা নিয়ন্ত্রণে গত চার বছরে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মিলিয়ে প্রায় ৫৪১ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। এর আগে ১৯৯৬-৯৭ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত ২৭ বছরে মশার ওষুধ, যন্ত্রপাতি, ওষুধ ছিটানো ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বেতন-ভাতাসহ ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ২৭৫ কোটি টাকার বেশি। এত বিপুল অর্থ খরচের পরও ঢাকায় মশার উপদ্রব এবং ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনগুলো এখনো মূলত কীটনাশক ও ওষুধের ওপর নির্ভরশীল। বছরের পর বছর একই ধরনের কীটনাশক ব্যবহারের কারণে মশার মধ্যে ওষুধপ্রতিরোধী ক্ষমতা তৈরি হচ্ছে। ফলে শুধু ওষুধ ছিটিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সমন্বিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থা।

নগর-পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য আলাদা একটি দক্ষ ইউনিট গঠন করা যেতে পারে, যেখানে পরিকল্পনাবিদ, জীববিজ্ঞানী ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা কাজ করবেন। তাঁর মতে, প্রচলিত ওষুধনির্ভর পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে না এলে ভবিষ্যতে নগরবাসীর দুর্ভোগ আরও বাড়বে।

চার বছরে দুই সিটির ব্যয় ৫৪১ কোটি টাকা

২০২৬-২৭ অর্থবছরসহ গত চার বছরে মশা নিয়ন্ত্রণে ডিএনসিসির ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৮৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরে ১১৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। মশার ওষুধ কেনা, আউটসোর্সিং, ফগার, হুইল স্প্রে মেশিন ও অন্যান্য সরঞ্জামের পেছনে এই অর্থ ব্যয় করার কথা।

অন্যদিকে একই সময়ে ডিএসসিসি মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যয় করেছে প্রায় ১৫৫ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এ খাতে প্রায় ৫৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া ১৯৯৬-৯৭ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত মশার ওষুধ ও যন্ত্রপাতি কেনা, ওষুধ ছিটানো এবং পরিবহন বাবদ দুই সিটি করপোরেশনের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭৬৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। একই সময়ে মশক বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় ব্যয় হয়েছে আরও প্রায় ৫০৬ কোটি টাকা

নানা উদ্যোগ, কিন্তু ফল মেলেনি

মশা নিয়ন্ত্রণে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন বিভিন্ন সময়ে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। ড্রেন ও জলাশয়ে গাপ্পি মাছ, হাঁস ও ব্যাঙ ছাড়া, ফিঙে পাখি আকৃষ্ট করা, কদমগাছ লাগানো এবং ড্রোন দিয়ে মশার প্রজননস্থল খোঁজার মতো কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে।

তবে এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে শুরু থেকেই বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন ছিল। কীটতত্ত্ববিদদের মতে, হাঁস, ব্যাঙ, পাখি বা কদমগাছের মাধ্যমে ঢাকার মতো বড় শহরে কার্যকরভাবে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। ফলে এসব কর্মসূচিকে অনেকেই অর্থের অপচয় হিসেবে দেখছেন।

কীটতত্ত্ববিদ মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরীর মতে, মশা নিয়ন্ত্রণে এমন পরীক্ষামূলক ও অবৈজ্ঞানিক কর্মসূচির পরিবর্তে কার্যকর কীটনাশক, আধুনিক প্রযুক্তি এবং বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।

সেপ্টেম্বরেই বাড়তে পারে ডেঙ্গু

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার জানিয়েছেন, আগস্টের শেষ দিকে এবং সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে তৈরি হওয়া বিভিন্ন জলাবদ্ধ স্থান ও পাত্রে এডিস মশার প্রজনন হয়েছে, যা এখন ডেঙ্গু ছড়ানোর জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দ্রুত মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে। এ কাজে সরকার, সিটি করপোরেশন, পরিবার ও সাধারণ মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। যেসব এলাকায় ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হচ্ছে, সেসব বাড়িকে কেন্দ্র করে উড়ন্ত মশা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও জোরদার করা জরুরি।

ক্র্যাশ প্রোগ্রাম ও কুইক রেসপন্স টিম

ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় দুই সিটি করপোরেশনও নতুন করে কার্যক্রম জোরদার করছে। ডিএসসিসি জানিয়েছে, কোনো এলাকায় মশার অভিযোগ পাওয়া গেলে সেখানে নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি ক্র্যাশ প্রোগ্রাম পরিচালনা করা হচ্ছে। এ সময় স্বাভাবিকের তুলনায় তিন গুণ কর্মী নিয়ে পুরো ওয়ার্ডে অভিযান চালানো হয়। সকালে লার্ভা ধ্বংস এবং বিকেলে উড়ন্ত মশা নিধনের কাজ চলে প্রায় এক সপ্তাহ।

ডিএনসিসিও ডেঙ্গু রোগীদের ঠিকানা সংগ্রহ করে সেখানে কুইক রেসপন্স টিম পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে। রোগীর বাড়ির আশপাশে মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংসের পাশাপাশি উড়ন্ত মশা নিয়ন্ত্রণের কাজ করা হচ্ছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব তাৎক্ষণিক কর্মসূচির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ও বিজ্ঞানভিত্তিক মশক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি। শুধু প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয় করে ওষুধ ছিটালে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না।