https://www.voiceofpeople24.com/

5423

health

ডা: এস.এম.আসাদুজ্জামান জুয়েল 

মানবিক পেশা চিকিৎসা হলেও  পেশাকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে

প্রকাশিত : ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ২০:২৫

 


মানবিকতা ধর্ম, বর্ণ, জাত, পাত, সম্প্রদায় নির্বিশেষে সবাই দেখাতে পারে তার কর্মের মাধ্যমে। কেননা, মানবিকতা মানুষের অন্তরাত্মার বাহ্যিক বহিঃপ্রকাশ, সেটি ধর্ম-সম্প্রদায় বা নির্দিষ্ট কোনো দেশ বা গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ নয়। যুগে যুগে মানুষের মানবিকতার স্তূতি যেমন বন্দনা করা হয়েছে, অমানবিকতার ঘৃণ্য প্রকাশও ঘটেছে নানাভাবে। তাই স্বীয় কর্মের জন্য কেউ হয়েছেন বরণীয়, স্মরণীয় আবার কেউ পতিত হয়েছেন ঘৃণার ভাগাড়ে। মানুষ যখন মানবিকতার গুণ হারিয়ে ফেলে তখন সমাজ তাকে পশুর সাথে তুলনা করে। অর্থাৎ পশুর মস্তিষ্ক কান্ডে সম্মুখ মস্তিষ্ক খন্ডক বা ঋৎড়হঃধষ খড়নব (ফ্রন্টাল লোব) সুপুষ্ট না হওয়ার কারণেই পশুরা পশু-আচরণ তথা ক্ষতিকারক কাজ করতে দ্বিধা করে না। তবে সমাজে মানুষ এককভাবে যেমন মানবিকতার কাজ করে মানবিক হয়, দলবদ্ধ বা গোষ্ঠীবদ্ধভাবে এবং পেশাগতভাবে স্বীয় পেশার দ্বারাও মানবিক হওয়া সম্ভব। সমাজে নানা পেশা রয়েছে। পেশাজীবীদের পেশার মান বজায় রাখতে হলে জনকল্যাণে মানবিক সেবা প্রদান জরুরি। সমাজে অনেক পেশার মধ্যে কয়েকটি পেশা যেমন চিকিৎসা, রাজনীতি, প্রকৌশল, ব্যবসায় ইত্যাদি পেশার বাজার রমরমা বলেই সমাজে চাউর আছে। শুরুতেই ব্যবসায় পেশার কথায় আসা যাক। অত্যন্ত চমৎকার এক পেশা। দেশকে এগিয়ে নিতে এ পেশার তুলনা মেলাভার, অর্থনীতির সূচক ঊর্ধ্বমুখী হয় ব্যবসায়ীদের জ্ঞানগত, গুণগত, সততা সমৃদ্ধ দেশি-বিদেশি আমদানি-রপ্তানিনির্ভর বাণিজ্যের কারণেই। ব্যবসায়ী অসৎ হলে জাতি ধ্বংস, দেশ দুর্নীতির তালিকাভুক্ত হতে বাধ্য বিশ^ পরিমন্ডলে। তাই সরকারি ও বেসরকারি ব্যবসাকে সর্বস্তর থেকে নানা উৎসাহ, প্রণোদনা, জবাবদিহিতা সরকার-জনগণ-মালিকপক্ষ সব সেক্টর থেকেই আসা বাঞ্ছনীয়। প্রকৌশল পেশার দিকে তাকালে প্রথমেই সমাজের প্রতি মেধাবীদের মুখগুলো ভেসে ওঠে এবং একই সাথে আশা জাগানিয়া তৈরি হয় এই ভেবে যে, কোটি কোটি দরিদ্র মানুষের এই বাংলাদেশ হয়তো এই মেধাবীমুখ প্রকৌশলীদের হাতে দেশের ইন্্ফ্রাস্ট্রাকচার বদলে গিয়ে অন্তত পুরো না হলেও কাছাকাছি সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, আবুধাবীর মতো হবে। ভ্রম কাটে তখনই যখন দেখি এই মেধাবী মুখ, মস্তিষ্ক-ব্রেন ড্রেন হয়ে ইউরোপ আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমাচ্ছে অথবা দেশেই ঘুষের অতলান্তে হাতড়িয়ে বেড়িয়ে কতিপয় পেশাকে কালিমালিপ্ত করছে, দেশকে লজ্জিত করছে। 
এবার ঘুরে আসি রাজনীতির পেশায়। চরমভাবে মারখাওয়া এককালের এই রাজনীতি পেশার পালে এখন হাওয়া লেগেছে। কেউ কেউ বলেই ফেলে রাজনীতি এখন ধস থেকে বস হয়ে গেছে। সরকারি বা সরকারের অনুকম্পাপুষ্ট বা তল্পিধারী তথাকথিত বিরোধীদল হলেও কতিপয় সুবিধাবাদী (সবাই নয়) রাজনীতিবিদের পোয়াবারো তথা কপাল খুলে যায়। রাতারাতি লাখপতি, কোটিপতি হতে সময় তেমন একটা লাগে না। অতীতে যেমনটি ছিল ফ্যাসিবাদী শাসনে সরকারের রোষানলে পড়ে গুপ্ত-সুপ্ত রাজনীতি, গুমের, খুনের, জেল-জুলুমের ভাগ্য বরণই ছিল বাস্তবতা। তখন হয়তো কেউ বুঝতেন না-‘এই দিন দিন নয়, আরো দিন আছে’-। তাই পেশার বাজারে এটি এখন অনেকে একনম্বর পেশাই বলতে কার্পণ্য করেনা- কি শিশু, যুবা, প্রৌঢ় সবাই। এবার বলি খধংঃ নঁঃ ঘড়ঃ ঃযব খবধংঃ ডাক্তারি বা চিকিৎসা পেশার কথা। কি বলবো ভাই ও বোন, এ পেশার কথা লিখতে গেলেই যেন পেটের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে। ত্ইা বলি হায়রে সময়। যে পেশায় ঢুকতে সবাই কতোনা চেষ্টা-তদ্বির, বুদ হয়ে ভর্তির জন্য পড়াশুনা, আরাম-হারাম করা হতো। বিয়ের বাজারেও ১নং তালিকায় থাকতো চিকিৎসা পেশাটি। অধুনা কালের পরম্পরায় চিকিৎসকদের নিরাপত্তাহীনতা, মব জাস্টিস, একশ্রেণি উজবুক শ্রেণির মানুষের অবিবেচনা প্রসূত মন্তব্য ও কর্মকান্ডের ফলে চিকিৎসকও জনগণকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়ার অযাচিত ভুলে অনেকেই এ অতি জনপ্রিয় মানবিক পেশাটির প্রতি খেই হারিয়ে ফেলছে। জানা যায়, এখন থেকে অনেক চিকিৎসক ও দম্পতির সন্তানরাও তাদের চিকিৎসক পিতা-মাতার দুরবস্থা দেখে আর ডাক্তারি পড়তে আগ্রহী হচ্ছে না। আর তাই, মনে করবেন না যে, এক ডাক্তার হয়ে আরেক ডাক্তারের সাফাই গাচ্ছি। খোঁজ নিয়ে দেখেন, ক’জন ডাক্তারের দু’জন, তিনজন সন্তান আছে? কাউরো ১জন বা বড়জোড় দু’জন আবার কেউ নি:সন্তান। কারণ, বড় বড় ডিগ্রি দেশের প্রয়োজনে, দশের প্রয়োজন নিতে গিয়ে বছরের পর বছর স্বামী এক বঙ্গে স্ত্রী আরেক বঙ্গে অবস্থান করেন, সন্তানরে ভাই হবে কেমনে? তারপরও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকবৃন্দ ও অন্যান্য চিকিৎসকবৃন্দ সমাজে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন নিয়মিতভাবে। অসৎ এর কথা বললে বলতে হয় অসৎ ব্যক্তির জন্য কোনো পেশা বা গোষ্ঠী বা কমিউনিটি দায়ী নয়। 
তাই সমাজ বিশ্লেষক ও চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে-মানবিক পেশা চিকিৎসা হলেও পেশাকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে। 
লেখক: চিকিৎসক ও সাংবাদিক।