https://www.voiceofpeople24.com/

4563

sports

অপূর্ণ গল্পের শেষ নায়ক নেইমার

প্রকাশিত : ২৪ জুন ২০২৬ ১১:৫৭

ফুটবল বড় অদ্ভুত এক পৃথিবী। কখনও নির্মম, কখনও নিষ্ঠুর। এখানে স্মরণ করা হয় বিজয়ীদের, আর ব্যর্থতার গল্পগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় সময়ের ধুলোর নিচে। অথচ প্রতিটি ট্রফির আড়ালেই লুকিয়ে থাকে কিছু অপূর্ণ স্বপ্ন, কিছু অসমাপ্ত কাহিনি।

ডালাসের নীরব রাতে বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রের দিকে তাকালে যেন সেই বৈপরীত্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে লিওনেল মেসিকে ঘিরে উচ্ছ্বাসের জোয়ার—যেন দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর রাজমুকুট পরা এক সম্রাট। আর অন্যদিকে নেইমার জুনিয়র; বিশ্বমঞ্চে যেন একাকী দাঁড়িয়ে থাকা একটি দ্বীপ, আলো-আঁধারির মাঝখানে হারিয়ে যাওয়া এক শিল্পী।

কিন্তু মহাকাব্যের নায়করা কি এত সহজে আড়ালে মিলিয়ে যান?

তাই হয়তো অসমাপ্ত কাব্যের শেষ ছত্রে নিজের নামটি আরেকবার লিখে রাখতে মায়ামির পথে হাঁটছেন নেইমার। দীর্ঘ ৯৮০ দিন পর আবারও ব্রাজিলের হলুদ-সবুজ জার্সির ১০ নম্বরটি তাঁর কাঁধে উঠতে যাচ্ছে। প্রায় তিন বছর পর জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামার অপেক্ষায় তিনি। আর ব্রাজিলের ১০ নম্বর জার্সি শুধু একটি সংখ্যা নয়—এটি একটি ঐতিহ্য, একটি উত্তরাধিকার, এক ধরনের রাজকীয় ক্ষমতা। যে জার্সি গায়ে চাপালে আলোটা স্বাভাবিকভাবেই এসে পড়ে একজন মানুষের ওপর।

আমেরিকায় আসার আগেই নেইমার জানিয়ে দিয়েছেন, এটাই তাঁর শেষ বিশ্বকাপ। শেষ যাত্রার আগে তাঁর চোখে তাই প্রথম প্রেমের মতোই এক আবেগ। দেশের হয়ে খেলার জন্য যে কিশোর একদিন বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে উঠেছিল, সেই ছেলেটি এখনও তাঁর ভেতরে বেঁচে আছে। শুধু শরীরটা আর আগের মতো সাড়া দেয় না সবসময়।

তবে কার্লো আনচেলত্তির পরিকল্পনায় এবার দেখা যেতে পারে ভিন্ন এক নেইমারকে। বয়স ও চোটের কারণে আগের সেই বিস্ফোরক গতি হয়তো আর নেই। কিন্তু তাঁর দৃষ্টিশক্তি, সৃজনশীলতা, খেলা পড়ার ক্ষমতা এবং নিখুঁত পাস দেওয়ার দক্ষতা এখনও বিশ্বমানের।

সেই কারণেই স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে তাঁকে উইংয়ের বদলে মাঠের কেন্দ্রভাগে, আক্রমণের মূল কারিগর হিসেবে ব্যবহার করার ভাবনা আনচেলত্তির। ফলস নাইন কিংবা অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের ভূমিকায় তিনি হতে পারেন ব্রাজিলের আক্রমণের হৃদস্পন্দন। রাফিনিয়ার জায়গা দলে নিলেও তাঁর ভূমিকা হবে সম্পূর্ণ আলাদা। উইংয়ে গতি নয়, মাঝমাঠে সৃজনশীলতার আলো ছড়াবেন তিনি।

হাইতির বিপক্ষে জয়ের পর আনচেলত্তি নিশ্চিত করেছেন নেইমারের একাদশে থাকার সম্ভাবনা। তবে তাঁর অবস্থান নিয়ে রহস্য বজায় রেখেছেন। সেটাই স্বাভাবিক। বড় ম্যাচের আগে কোনো কোচই নিজের পরিকল্পনা প্রকাশ করতে চান না।

তবে একটি বিষয়ে আনচেলত্তির বক্তব্য বারবার একই জায়গায় ফিরে এসেছে—নেইমার শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি এই দলের মেন্টর, অনুপ্রেরণা এবং আত্মবিশ্বাসের আরেক নাম।

সত্যিই তাই। জাতীয় দলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে তাঁর উপস্থিতিই বদলে দিতে পারে ব্রাজিলের চেহারা। মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচে স্পষ্ট দেখা গেছে, শেষ মুহূর্তে শুধু পরিশ্রমী ফুটবলার নয়, একজন শিল্পীরও প্রয়োজন হয়। একজন এমন মানুষ, যিনি এক মুহূর্তের জাদুতে ম্যাচের গল্প বদলে দিতে পারেন।

স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ব্রাজিলের লক্ষ্যও পরিষ্কার—জয় এবং যত বেশি সম্ভব গোল। গ্রুপের শীর্ষস্থান নিশ্চিত করতে গোল ব্যবধান গুরুত্বপূর্ণ। আর এমন মঞ্চে নেইমারের মতো একজন সৃষ্টিশীল খেলোয়াড়ের প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি।

ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ইতিহাসে নেইমার যেন এক অসমাপ্ত উপন্যাস। পেলে বিশ্বকাপ জিতে কিংবদন্তি হয়েছেন। রোমারিও, রোনালদো, রিভালদোরা নিজেদের অমরত্ব নিশ্চিত করেছেন সোনালি ট্রফির স্পর্শে।

নেইমার?

তিনি হয়তো এই শতাব্দীর সবচেয়ে প্রতিভাবান ফুটবলারদের একজন, তবুও তাঁর গল্পের বড় অংশ জুড়ে আছে আঘাত, হতাশা আর অপূর্ণতা।

২০১৪ সালে ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে পিঠের চোট তাঁকে ছিটকে দিয়েছিল। ২০১৮ সালে বেলজিয়ামের কাছে স্বপ্নভঙ্গ। ২০২২ সালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে অতিমানবীয় গোল করার পরও টাইব্রেকারের নির্মম পরিণতি।

নেইমারের গল্প যেন সবসময় একই—প্রথমে বিস্ময়, তারপর বিষাদ।

তবু ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রদ্রিগো কিংবা রাফিনিয়ারা যতই ইউরোপ মাতাক না কেন, ব্রাজিলের ১০ নম্বর জার্সির ওজন অন্যরকম। সেই জার্সিতে জড়িয়ে আছে পেলের উত্তরাধিকার, জোগো বোনিতোর সৌন্দর্য, আর ফুটবলকে শিল্পে রূপ দেওয়ার দর্শন।

নেইমার সেই উত্তরাধিকারের শেষ মহান প্রতিনিধি।

প্রতিপক্ষ স্কটল্যান্ড। ইতিহাস অবশ্য ব্রাজিলের পক্ষেই কথা বলে। দুই দলের ১০টি সাক্ষাতের মধ্যে আটটিতে জয় ব্রাজিলের, দুটি ড্র। স্কটল্যান্ড এখনও সেলেসাওদের বিপক্ষে জয়ের মুখ দেখেনি।

কিন্তু ফুটবল শুধু ইতিহাসের খেলা নয়। স্কটল্যান্ডের শারীরিক শক্তি, শৃঙ্খলিত রক্ষণ এবং কঠিন ট্যাকল যে কোনো দলের জন্যই পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন পর ফেরা নেইমারের জন্য।

তবু ব্রাজিলিয়ান শিবিরের খবর বলছে, এবার তিনি কোনো হিসাব কষে খেলতে নামছেন না।

এটি তাঁর চতুর্থ বিশ্বকাপ।

এবং সম্ভবত শেষ।

হারানোর আর কিছু নেই। পাওয়ার আছে শুধু একটি স্বপ্ন—সেই সোনালি ট্রফি, যা তাঁর ক্যারিয়ারের একমাত্র অপূর্ণতা।

তাহলে কি এবার নেইমার তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপটাকে মুছে ফেলবেন?

নাকি ফুটবল আবারও তার প্রিয়তম শিল্পীর সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণ করবে?

উত্তরটা আপাতত সময়ের কাছেই জমা থাক। তবে এতটুকু নিশ্চিত—অসমাপ্ত কাব্যের শেষ ছত্র এখনও লেখা বাকি। আর সেই কলমটি এখনও নেইমারের হাতেই আছে