https://www.voiceofpeople24.com/
4468
sylhet
প্রকাশিত : ০৯ জুন ২০২৬ ১৩:৪১
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও অর্থনীতি দিন দিন গভীর সংকটের মুখে পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী-খাল পুনঃখনন ও স্বাভাবিক পানি প্রবাহ নিশ্চিত না করে বছরের পর বছর কেবল ফসল রক্ষার বাঁধ নির্মাণে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। স্বল্পমেয়াদে বাঁধ ফসল রক্ষায় কিছুটা ভূমিকা রাখলেও দীর্ঘমেয়াদে তা হাওরের পরিবেশ-প্রতিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এক সময়ের খরস্রোতা নদীগুলো এখন ভরাট হয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। কোথাও নদী খালে পরিণত হয়েছে, কোথাও আবার নদীর বুক দখল করে গড়ে উঠেছে বসতি। ফলে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, বাড়ছে জলাবদ্ধতা, কমছে মাছের উৎপাদন এবং হুমকির মুখে পড়ছে জীববৈচিত্র্য।
জগন্নাথপুর উপজেলার নলজুর নদী এর অন্যতম উদাহরণ। একসময় প্রায় ২৫০ ফুট প্রশস্ত এই নদীতে লঞ্চ চলাচল করলেও বর্তমানে এটি অনেক স্থানে ভরাট ও দখল হয়ে খালের রূপ নিয়েছে। এতে নলুয়ার হাওরের পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে। একই উপজেলার কাটাগাঙ ভরাট হয়ে যাওয়ায় মইয়ার হাওরেও চর জেগে উঠেছে এবং হাওরজুড়ে গড়ে উঠেছে নতুন বসতি।
সীমান্তবর্তী যাদুকাটা নদীর বিশ্বম্ভরপুর অংশেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। নদীর বুকে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ঘরবাড়ি। সিরাজপুর, চরপাড়া, জামালপুর ও বড়খলা গ্রামের অনেক মানুষ নদীর জায়গা দখল করে বসবাস করছেন। অপরদিকে দামালিয়া নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় করচার হাওরে পানি নিষ্কাশন কমে গেছে। এর ফলে চলতি মৌসুমেও জলাবদ্ধতায় হাজারো কৃষকের বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তাহিরপুর উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের কালাগাঙ নদীতে ২০১২ সালে একটি বাঁধ নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে ওই বাঁধের ওপরই বাজার গড়ে উঠেছে। একই নদীর আরেক অংশে পুঠিমারার পালই বিল সংযোগস্থলেও বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে পানি প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
তাহিরপুরের নদীগুলো মূলত আন্তঃসীমান্ত নদী, যেগুলো গারো পাহাড় থেকে নেমে এসেছে। এসব নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। টাঙ্গুয়ার হাওরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত মনাই নদীতেও বাঁধ নির্মাণের ফলে পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদী খননের পরিবর্তে বিভিন্ন স্থানে অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের কারণে সুনামগঞ্জের ছোট-বড় ১০৬টি নদীর অধিকাংশই এখন বিপন্ন। এর প্রভাব পড়েছে হাওর ও বিলের ওপর। পানি ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ায় হাওরগুলো ক্রমেই হারাচ্ছে তাদের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য।
কালাগাঙ নদীতে বাঁধ নির্মাণ প্রসঙ্গে উন্নয়ন সংস্থা সিএনআরএসের কর্মকর্তা ইয়াহিয়া সাজ্জাদ গণমাধ্যমকে জানান, স্থানীয় জনগণের দাবির মুখেই ওই বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল।
৭ বছরে বাঁধে ব্যয় প্রায় ৮০০ কোটি টাকা
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত সাত বছরে সুনামগঞ্জে নদী খননের পরিবর্তে বিভিন্ন বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। তবে এ ব্যয়ের একটি বড় অংশে অনিয়ম ও লুটপাটের অভিযোগও রয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে ব্যয় হয় ১০৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে ১১০ কোটি ৮০ লাখ, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৯৫ কোটি ৫২ লাখ, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৫৫ কোটি ২১ লাখ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১০১ কোটি ৮০ লাখ, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১০৩ কোটি ৭৭ লাখ এবং চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৪৯ কোটি টাকা।
পরিবেশবিদ ও স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, টেকসইভাবে হাওর রক্ষা করতে হলে কেবল বাঁধ নির্মাণ নয়, নদী-খাল পুনঃখনন, দখলমুক্তকরণ এবং স্বাভাবিক পানি প্রবাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের পরিবেশ ও অর্থনীতি আরও বড় সংকটের মুখে পড়বে।