সত্য প্রচার যত কঠিন, গুজব ছড়ানো ততই সহজ
সমাজে প্রচলিত আছে-‘ধর্মের ঢাক এমনিতেই বাজে’, ‘প্রচারেই প্রসার’ ইত্যাদি। তবে ঢুলি বা ঢাকী যখন ঢাক (ঢোল, এক ধরনের শব্দ উৎপাদক যন্ত্র) বাজায়, তখন শব্দ তৈরিতে কাঠি লাগে যাকে ঢাকের কাঠি বলে (যদিও ঢাকের কাঠি বলে বাগধারা রয়েছে- যার অর্থ - চাটুকার বা তোষামুদে অর্থাৎ শুধু শব্দ তৈরিতে ওস্তাদ বা তর্জন-গর্জন, অন্ত:সার শূন্য)। কিন্তু ধর্মের ঢাক বাজাতে কোনো কাঠি বা হাতের ব্যবহার লাগেনা। তা আপনা আপনিই সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ শুদ্ধচর্চা, ভাল কাজ, মানবিক অনুশীলন, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সদুপদেশ, ধর্মীয় শুভ বাণী ও আচার এমনিতেই সমাজে স্পন্দন জাগায়। প্রচারেই প্রসার শব্দমালার বিন্যাসে দেখা যায়, কথাটির দ্বি-মাত্রিক ব্যাখ্যা রয়েছে। মাত্রা এক, যে-কোনো ঘটনা, দ্রব্যাদির প্রচার তথ্য বিজ্ঞাপনেই অধিক পরিচিত লাভ ঘটে এবং তা বিপণনে গতি সঞ্চার করে। মাত্রা দুই. নি¤œমানের পণ্যের প্রচার লাগে, কিন্তু ভালোমানের পণ্যের জন্য অধিক প্রচারের প্রয়োজন নেই। সে যাহোক, সময় ও কালের বিবর্তনে বিশ^ অনেক দ্রুত এগিয়ে চলেছে। পূর্বে যেমন সংবাদ স্থানান্তরে রাজ-রাজড়া, সম্প্রাটগণ কবুতরের পায়ে চিঠি বেঁধে তা অন্যত্র প্রেরণ করতো, ঘোড়ায় চড়ে বাহকের বা দূতের মাধ্যমে সংবাদ বা চিঠি চালাচালি হতো। সভ্যতার মধ্যজগতে বা মধ্যগগনে শুরু হলো ডাক বিভাগের কর্মযজ্ঞ, ল্যান্ডফোন, টরেটক্কা, টেলিফোন, টেলিগ্রাম, ই-মেইল, জি-মেইল, ইত্যাদি।
অতি আধুনিকতার ছোঁয়ায় প্রচারের জন্য রেডিও, টিভি, ই-মেইল মোবাইল ফোন, হোয়াট্্স অ্যাপ, ইন্সটাগ্রাম, টুইটার, ফ্যাক্স, ফেসবুক ইত্যাদির আগমন ঘটে। তবে সমাজ বিশ্লেষক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে-সত্য-মিথ্যা, ফেক তথ্য, অপতথ্য ও গুজব এর ডামাডোলে বিশ^বাসী সঠিক ও বেটিক তথ্য কোনটি তা প্রায়শই বুঝতে পারছেনা। আবার অ/ও (অৎঃরভরপরধষ ওহঃবষষরমবহপব) এর প্রভাবে সত্য মিথ্যা যাচাই জটিল হয়ে পড়েছে। ফলে বিশ^বাসী রয়েছে গোলক ধাঁধাঁর মধ্যে। আবার মানবতাবোধের চরম ধসের কারণে সত্য প্রচারও কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই সুশীল সমাজের বক্তব্য গুজবে কান দেবেন না। সত্য-মিথ্যা গুজব যাচাই করুণ। তবে বিশে^র তথাকথিত গণতন্ত্রের নামে অগণতান্ত্রিক চর্চা, সমাজতন্ত্রের নামে জাতি নির্যাতন, নিষ্পেষণ, বিরোধীমত পিষে ফেলা-র চর্চার কারণেও সত্য প্রচার প্রায়ই আলোর মুখ দেখেনা। সরকারি, বেসরকারি নানা চ্যানেলের ভিন্নভিন্ন রাজনৈতিক মতামতের কারণে প্রচারযন্ত্রকে যথেষ্ট স্বাধীনতা না দেয়ার ফলেও সত্য প্রচারে মারাত্মক বিঘœ ঘটে। পাশাপাশি গুজবের প্রতি আদিকাল থেকেই মানুষের আকর্ষণ অতি বেশি। কেননা, গুজবে অনেক রং চং মেখে, কৃত্রিম শাব্দিক কাঠামো তৈরি করে মনগড়া গল্প ফেঁদে, নিজেকে ‘মুই কি হনুরে’ ভেবে যাচ্ছে তাই অপতথ্যে ভরিয়ে এবং তা জনসম্মুখে, জনমনে ছড়িয়ে দিতে পারলেই জীব শ্রেষ্ঠ অথচ সরল হৃদয়ের মানুষ তা লুফে নিয়ে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি, দেশ থেকে দেশান্তরে প্রচারে অতি ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ‘চিলে কান নিয়ে গেছে কেউ বললেই যেমন নিজের কানে হাত না লাগিয়েই চিল নামক পাখির পেছনে অনেকেই ছুটতে থাকে’-ব্যাপারটি এমনই। তাইতো সমাজবিজ্ঞানীদের মতে সত্য প্রচার যত কঠিন, গুজব ছড়ানো ততই সহজ।
লেখক: চিকিৎসক ও সাংবাদিক।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.