মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দৌড়ঝাঁপ শুরু

প্রকাশিত: ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৩:০৪ (শুক্রবার)
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দৌড়ঝাঁপ শুরু

 

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন একটি মৌসুম শুরু হয়েছেভ সেই মৌসুম ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে। সিএনএন বলছে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুর দিকের নানা রাজনৈতিক টানাপোড়েনে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এতদিন অনেক দূরের বিষয় মনে হচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা বাড়তে শুরু করেছে।

২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসই একমাত্র সম্ভাব্য প্রার্থী নন, যিনি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন।

নিউইয়র্কের কংগ্রেস সদস্য আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে নিজের প্রভাব আরও বাড়াচ্ছেন। জর্জিয়ার সিনেটর জন অসফ এখনো নিজের পুনর্নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারেননি, কিন্তু এরইমধ্যে ২০২৮ সালের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তার নাম আলোচনায় এসেছে।

এ ছাড়া, ইলিনয়ের গভর্নর জেবি প্রিটজকার, কেনটাকির গভর্নর অ্যান্ডি বেসিয়ার ও পেনসিলভানিয়ার গভর্নর জশ শাপিরোর রাজনৈতিক তৎপরতাও বাড়ছে।

রিপাবলিকান শিবিরেও একই চিত্র। বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের প্রতিটি বক্তব্য ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ এখন বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ ট্রাম্পের ছায়াতেই ভবিষ্যতে তাকে প্রেসিডেন্ট পদে লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি করতে হচ্ছে।

সিনেটর টেড ক্রুজ, র্যান্ড পলসহ আরও কয়েকজন রিপাবলিকানও প্রকাশ্যে সম্ভাব্য প্রার্থিতা নিয়ে ভাবার কথা জানিয়েছেন। লুইসিয়ানার ৭৪ বছর বয়সী সিনেটর জন কেনেডি অবশ্য বলেছেন, তিনি সিনেটে পুনর্নির্বাচনের জন্য লড়বেন।

তবে গত মঙ্গলবার প্রকাশিত দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট পদে ‘অনেক অযোগ্য লোক’ প্রার্থী হলে তিনিও শীর্ষ পদটির জন্য চেষ্টা করতে পারেন।

সিএনএন জানিয়েছে, এটাই সম্ভবত পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রাথমিক পর্যায়ের চিত্র, অনেক রাজনীতিক আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে ভাবছেন, ‘আমি কেন নই?’

২০২৮ সালের নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। কারণ দুই প্রধান দলেরই প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টের মনোনয়ন নতুন নেতৃত্বের হাতে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

রিপাবলিকান দলের সম্ভাব্য প্রার্থীকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ বা ‘মাগা’ রাজনীতির ভবিষ্যৎ কী হবে, নাকি দলটি আবার চিরাচরিত রক্ষণশীল অবস্থানে ফিরবে। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটদের প্রয়োজন এমন একজন নেতা, যিনি প্রগতিশীল ও মধ্যপন্থি দুই অংশকে একসঙ্গে রাখতে পারবেন।

আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পবিরোধী অবস্থান কার্যকর হতে পারে। তবে জনমত জরিপগুলোয় দেখা যাচ্ছে, জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় যে দলটি ভোটারদের আস্থা হারিয়েছিল, সেই দল নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ এখনো পুরোপুরি কাটেনি।

গত মঙ্গলবার দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজের একটি সাক্ষাৎকারে ২০২৮ সালের সম্ভাব্য দৌড় নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।

নিউইয়র্কের এই ডেমোক্র্যাট নেতা মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারে নিজের সক্রিয়তা বাড়িয়ে স্বতন্ত্র সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সের প্রগতিশীল রাজনৈতিক আন্দোলনের উত্তরসূরি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। ট্রাম্প আমলের রাজনীতিতে আলোচনা জন্ম দেওয়ার মতো নানা বিষয়েও তিনি সক্রিয়।

এদিকে, ৩৭ বছরে পা দিতে যাওয়া আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ বলেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ হয়তো জীবনে একবারই আসে। তবে একইসঙ্গে তিনি নির্বাচনে জেতার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্নের কথা স্বীকার করেছেন। এই প্রশ্নের সঙ্গে কমলা হ্যারিসের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও জড়িত। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের কাছে পরাজিত হওয়ার পর তিনি ২০২৮ সালে আবার প্রেসিডেন্ট পদে লড়বেন কি না, সে সিদ্ধান্ত নেননি।

তবে ডেমোক্র্যাটিক দলের আরও কয়েকজন সম্ভাব্য প্রার্থী নিজেদের অবস্থান তৈরি করছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন গভর্নরও রয়েছেন।

পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের গভর্নর জশ শাপিরো সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ন্ত্রণে সরকারি নীতিমালা প্রয়োজন কি না, সেই জাতীয় বিতর্কে অংশ নিয়েছেন। এআইয়ের সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগকে ট্রাম্প ‘হোক্স’ বা ভুয়া প্রচারণা হিসেবে অভিহিত করায় শাপিরো তার সমালোচনা করেন।

কেনটাকির গভর্নর অ্যান্ডি বেসিয়ার গত মঙ্গলবার নতুন বই প্রকাশ করেছেন ‘গো অ্যান্ড ডু লাইকওয়াইজ: হাউ উই হিল অ্যা ব্রোকেন কান্ট্রি’ নামে। জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি তৈরির ক্ষেত্রে গভর্নরদের বই প্রকাশ একটি পুরোনো রাজনৈতিক কৌশল।

সিএনএনের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বেসিয়ার বলেন, দেশের যেসব অঞ্চলে ডেমোক্র্যাটরা দীর্ঘদিন ধরে যায়নি, সেসব জায়গায় যেতে হবে। কয়লা খনি ও কৃষিপ্রধান এলাকার মানুষের কথা শুনতে হবে।

২০২৮ সালে প্রেসিডেন্ট পদে লড়বেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেননি।

ট্রাম্প সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে নিয়ে রসিকতা করেছেন। তবে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট মেয়াদ যখন শেষের দিকে যাবে, তখন বিষয়টি আর এতটা মজার থাকবে না।

ভ্যান্সকে রিপাবলিকান দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে রুবিওর পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।

গত শুক্রবার ভ্যান্স আইওয়া সফর করেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রাথমিক বাছাইপর্বে আইওয়া গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গরাজ্য। সেখানে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ায় সিনেট ও গভর্নর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রত্যাশার চেয়েও বেশি কঠিন হয়ে উঠেছে।

ভ্যান্সের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি ট্রাম্পের উত্তরসূরি হওয়ার সম্ভাবনা এবং ট্রাম্পের রাজনৈতিক ছায়া থেকে বের হয়ে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করা। তার নিজস্ব নির্বাচনী বিজয়ের অভিজ্ঞতাও তুলনামূলকভাবে সীমিত, বর্তমান দায়িত্বে আসার আগে তিনি মাত্র দুই বছর সিনেটর ছিলেন।

২০১৬ সালের রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট মনোনয়ন দৌড়ে ট্রাম্পের কাছে হেরে যাওয়া টেড ক্রুজও আবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়ার আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

গত আগস্টে টেক্সাসের লেফটেন্যান্ট গভর্নর ড্যান প্যাট্রিকের পডকাস্টে ক্রুজ বলেন, ‘আমি প্রেসিডেন্ট হতে চাই, এটা কোনো গোপন বিষয় নয়।’ তবে তিনি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি।

সম্ভাব্য রিপাবলিকান প্রার্থীদের তালিকায় আরও রয়েছেন টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট, ফ্লোরিডার বিদায়ী গভর্নর ও ২০২৪ সালের রিপাবলিকান প্রার্থী রন ডিস্যান্টিস ও ফ্লোরিডার সিনেটর রিক স্কট।

কেনটাকির সিনেটর র‌্যান্ড পল, যিনি ২০১৬ সালে ট্রাম্পের কাছে হেরেছিলেন, মুক্তবাজার ও শুল্কবিরোধী অবস্থানের একজন প্রার্থীর প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন। সেই প্রার্থী তিনি নিজেই কি না, তা অবশ্য এখনো পরিষ্কার নয়।

ওয়াশিংটন পোস্টকে তিনি বলেছেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়ার বিষয়ে তার সিদ্ধান্ত এখন ‘৫০-৫০’। তবে এমন কোনো প্রার্থীও সামনে আসতে পারেন, যার নাম এখনো কেউ ভাবেনি। কারণ ২০১৬ সালের আগে ট্রাম্পকেও রিপাবলিকান দলের মূলধারার বাইরে থাকা একজন রাজনৈতিক চরিত্র হিসেবে দেখা হতো। পরে তিনিই দলটির রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আনেন।

ডেমোক্র্যাটিক দলেও একই ধরনের জনপ্রিয়তাবাদী পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। এই মুহূর্তে হয়তো পরবর্তী প্রেসিডেন্ট কে হবেন, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নয়। এখন মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের মতো বিষয়গুলোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তবে আগামী ৪ নভেম্বর যখন যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল জানতে রাত জাগবেন এবং কংগ্রেসের আসনগুলোর ফলাফল টেলিভিশনের ‘ম্যাজিক ওয়াল’-এ দেখতে থাকবেন, তখন পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন কার্যত শুরু হয়ে যাবে।

 

 

 

 

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোতাহার হোসেন

মোবাইল: ০১৩৩২-৮৪৫৬৯৯

তথ্য ও প্রযুক্তি সহযোগী - আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.