চিকিৎসক অর্ধেক, নেই আইসিইউ-সিসিইউ; সংকটে মৌলভীবাজার হাসপাতাল

প্রকাশিত: ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:১২ (বুধবার)
চিকিৎসক অর্ধেক, নেই আইসিইউ-সিসিইউ; সংকটে মৌলভীবাজার হাসপাতাল

মৌলভীবাজারের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স ও টেকনোলজিস্টের সংকটের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাবে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। ৮৪ জন চিকিৎসকের পদ থাকলেও বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৪২ জন। ফলে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।

হাসপাতালটিতে প্রতিদিন গড়ে ৪৫০ থেকে ৫০০ রোগী ভর্তি থাকেন। অথচ অনুমোদিত শয্যা রয়েছে ২৫০টি। অতিরিক্ত রোগীদের বিভিন্ন ওয়ার্ডের মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এর বাইরে বহির্বিভাগে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৬০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত হওয়ার পর ২০১২ সালে নতুন ভবনে কার্যক্রম শুরু হয়। ওই সময় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) ও করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) চালুর জন্য ২০টি শয্যার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। কিন্তু চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে এক যুগেও সেবাগুলো চালু করা সম্ভব হয়নি।

বর্তমানে হাসপাতালটিতে ৮৪ জন চিকিৎসকের পদ থাকলেও ৭ জন সিনিয়র কনসালট্যান্টসহ ৪২টি পদই শূন্য। পাশাপাশি রয়েছে নার্স ও টেকনোলজিস্ট সংকট। ১৪ জন টেকনোলজিস্টের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৯ জন। সব মিলিয়ে হাসপাতালের ৪০৮টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ১০৩টি পদ শূন্য রয়েছে।

যন্ত্রপাতি ও জনবল সংকটে ব্যাহত হচ্ছে রোগনির্ণয়ের পরীক্ষাও। ২০২১ সাল থেকে এমআরআই মেশিন নষ্ট থাকায় এ সেবা পুরোপুরি বন্ধ। প্যাথলজিতে নিয়মিত করা হচ্ছে মাত্র ১২ ধরনের পরীক্ষা। টেকনোলজিস্ট ও সংশ্লিষ্ট কনসালট্যান্টের সংকটে সপ্তাহে নির্দিষ্ট কয়েক দিন এক্স-রে, সিটি স্ক্যান ও আলট্রাসনোগ্রাফি করা হচ্ছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এক্স-রে সেবা সপ্তাহে তিন দিন, সিটি স্ক্যান দুই দিন এবং আলট্রাসনোগ্রাফি চার দিন চালু থাকে। ফলে জরুরি প্রয়োজনে অনেক রোগীকেই বাইরে গিয়ে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি সংকট দেখা দিয়েছে কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস সেবায়। প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপকরণের ঘাটতি এবং পর্যাপ্ত মেশিন না থাকায় প্রায় ২০০ রোগী ডায়ালাইসিসের অপেক্ষায় রয়েছেন বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসক কম থাকায় বহির্বিভাগে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা হাসপাতাল থেকে না পেয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যেতে হচ্ছে তাঁদের।

পারুল বেগম নামের এক রোগী বলেন, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় উপকরণের সংকটে তাঁর রক্ত পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি। তাঁর ভাষ্য, হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসার বাইরে অনেক সেবা পাওয়া যায় না এবং সামান্য জটিলতা দেখা দিলেই রোগীকে সিলেটে পাঠানো হয়।

কিডনি রোগী আলতা মিয়া বলেন, ডায়ালাইসিসের জন্য যোগাযোগ করেও তিনি সময়সূচি পাননি। তাঁর অভিযোগ, হাসপাতালে এমআরআই, সিসিইউ ও আইসিইউ—কোনোটিই চালু নেই।

এক রোগীর স্বজন ইয়ামিন মিয়া জানান, তাঁর শাশুড়ির আলট্রাসনোগ্রাফি প্রয়োজন হলেও হাসপাতালে গিয়ে সেবা বন্ধ পাওয়া যায়। পরে বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা করাতে হয়েছে।

আরেক রোগীর স্বজন শাকের আহমেদ বলেন, তাঁর খালার নিয়মিত ডায়ালাইসিস প্রয়োজন ছিল। মৌলভীবাজার হাসপাতালে একাধিকবার যোগাযোগ করেও সিরিয়াল না পাওয়ায় আর্থিক সংকটের মধ্যে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছিল। নিয়মিত ডায়ালাইসিস করাতে না পারায় পরে তাঁর খালা মারা যান বলে জানান তিনি।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক প্রণয় কান্তি দাস বলেন, হাসপাতালে নানা ধরনের সংকট রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে কর্তৃপক্ষ কাজ করছে এবং বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, ২৫০ শয্যার হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০০ রোগী ভর্তি থাকায় জনবলসংকটের মধ্যে এত রোগীর চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোতাহার হোসেন

মোবাইল: ০১৩৩২-৮৪৫৬৯৯

তথ্য ও প্রযুক্তি সহযোগী - আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.