নবীগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনার আড়ালে শিক্ষক হত্যার অভিযোগ, বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

প্রকাশিত: ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১০:৪৬ (শনিবার)
নবীগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনার আড়ালে শিক্ষক হত্যার অভিযোগ, বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে আলোচিত সড়ক দুর্ঘটনার তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে হাইওয়ে পুলিশ। দুর্ঘটনা হিসেবে শুরু হওয়া ঘটনাটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে পুলিশের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। দাম্পত্য বিরোধের জেরে শিক্ষক মাসুক পারভেজকে হত্যার পর ঘটনাটি সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ।

এ ঘটনায় মাসুক পারভেজের সঙ্গে থাকা তাঁর অফিস সহকারী শামীম আহমেদও গুরুতর আহত হয়ে পরে মারা যান। শামীমের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। পরিবারের দাবি, কোনো অপরাধ না করেও পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন তিনি।

হাইওয়ে পুলিশের অনুসন্ধান অনুযায়ী, শিক্ষক মাসুক পারভেজকে হত্যার পরিকল্পনায় তাঁর সাবেক স্ত্রী আমিনা বেগম হ্যাপী ও তাঁর ভাই সিরাজুল ইসলাম জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এ ঘটনায় এখনো হত্যা মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গত ২৯ আগস্ট শনিবার সকালে মাসুক পারভেজের বড় মেয়ে মিতি বেগমকে ফোন করেন তাঁর মা আমিনা বেগম। মেয়েকে দিয়ে বাবাকে নতুন কাপড়, জুতা ও ছাতা নিয়ে আসতে বলা হয়।

মেয়ের অনুরোধে সাড়া দিয়ে ওই দিন দুপুরে নবীগঞ্জ থেকে মোটরসাইকেলে করে পানিউদা গ্রামে সাবেক শ্বশুরবাড়িতে যান মাসুক পারভেজ। মেয়ের সঙ্গে দেখা করে ফেরার সময় তাঁর পিছু নেন সাবেক শ্যালক সিরাজুল ইসলাম।

পুলিশের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, পানিউদা থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে সদরঘাট নতুন বাজার এলাকায় একটি নম্বরবিহীন ডিআই পিকআপ দিয়ে মাসুকের মোটরসাইকেলে পেছন থেকে ধাক্কা দেওয়া হয়।

ধাক্কায় মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে পড়ে যান মাসুক। এরপরও পিকআপটি তাঁর ওপর দিয়ে চালিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে ঘটনাস্থলেই গুরুতর আহত হন মাসুক পারভেজ। তাঁর সঙ্গে থাকা অফিস সহকারী শামীম আহমেদও গুরুতর আহত হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

দাম্পত্য বিরোধের জেরে হত্যার অভিযোগ

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রায় ১২ বছর আগে পানিউদা গ্রামের খাইরুল ইসলামের মেয়ে আমিনা বেগমের সঙ্গে মাসুক পারভেজের বিয়ে হয়। তাঁদের দুই মেয়ে—মিতি ও মিতু।

দাম্পত্য কলহের কারণে প্রায় পাঁচ বছর ধরে দুই সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে থাকতেন আমিনা। এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যৌতুকসহ বিভিন্ন অভিযোগে একাধিক মামলা চলছিল।

সম্প্রতি একটি যৌতুক মামলায় আদালতের রায় মাসুক পারভেজের পক্ষে যায়। একই সঙ্গে মাসে একবার দুই মেয়ের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পান তিনি। এরপর থেকেই সাবেক শ্বশুরবাড়ির লোকজন ক্ষুব্ধ ছিলেন বলে পুলিশ জানতে পেরেছে।

পুলিশের অনুসন্ধান অনুযায়ী, প্রায় চার মাস আগে মাসুককে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। ঘটনার দুই মাস আগে সিরাজুল ইসলাম স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছ থেকে একটি রেজিস্ট্রেশনবিহীন ডিআই পিকআপ ভ্যান কেনেন বলেও জানা গেছে।

ঘটনার দিন ওই গাড়ি নিয়ে মাসুকের পিছু নিয়ে তাঁকে ধাক্কা দেওয়া হয় বলে পুলিশের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। পরে সিরাজুল একটি বাড়িতে আশ্রয় নিলে স্থানীয়রা তাঁকে আটক করেন বলে জানা গেছে।

‘আমার ছেলে সম্পূর্ণ নির্দোষ’

নিহত শামীম আহমেদের বাবা ইসমত মিয়া বলেন, তাঁর ছেলে কোনোভাবেই এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।

তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে সম্পূর্ণ নির্দোষ ছিল। সে শুধু বন্ধু মাসুকের সঙ্গে তার শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিল। ফেরার পথে তার শ্যালক ট্রাকচাপা দিয়ে আমার ছেলেকে হত্যা করেছে। আমি এই হত্যার বিচার চাই।’

শামীমের মা করুণা বেগম বলেন, ‘আমি আমার ছেলেকে ফেরত চাই। আমার ছেলের কী অপরাধ ছিল যে তাকে এভাবে হত্যা করা হলো? আমার ছেলে বলছিল বাড়ি এসে ভাত খাবে, কিন্তু সে আর ফিরল না।’

মামলা প্রক্রিয়াধীন

গোল্ডবাভ আব্দুল মান্নান চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কামাল উদ্দিন বলেন, বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাসুক পারভেজ ও পিয়ন শামীম আহমেদ মোটরসাইকেলে করে যাওয়ার পথে এই ঘটনার শিকার হয়েছেন। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেন।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বাউল শামীম ও স্থানীয় যুবক আরিয়ান হাসান জানান, পিকআপটি পেছন থেকে মোটরসাইকেলটিকে ধাক্কা দেওয়ার পরও চালক গাড়িটি সরিয়ে না নিয়ে আবারও চাপা দেন বলে তাঁরা দেখেছেন। এতে তাঁরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।

শেরপুর হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনিসুর রহমান বলেন, ‘ঘটনাটি নিয়ে আমরা পাঁচ দিন ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে বেশ কিছু ক্লু পেয়েছি। চালক তাঁর বোনের জামাইকে চাপা দিয়েছেন। লাইসেন্সবিহীন গাড়ি দিয়ে কীভাবে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। হত্যা মামলা গ্রহণের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে।’

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোতাহার হোসেন

মোবাইল: ০১৩৩২-৮৪৫৬৯৯

তথ্য ও প্রযুক্তি সহযোগী - আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.