মৌলভীবাজারের ভূমি অফিসে ঘুষ ছাড়া মেলে না সেবা, বাড়তি খাজনার অভিযোগ
মৌলভীবাজারের বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিয়ন ভূমি অফিসে জমিসংক্রান্ত সেবা নিতে গিয়ে ঘুষ ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। জমির খাজনা পরিশোধ, নামজারি, মিস কেসসহ বিভিন্ন কাজে সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
রাজনগরের নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান কামরুল ইসলাম। বাপ-দাদার ২৫ শতক জমির মধ্যে উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি পেয়েছেন ২ শতক। ওই জমি বিক্রির জন্য খাজনা পরিশোধ করতে ইউনিয়ন ভূমি অফিসে গেলে সংশ্লিষ্ট ভূমি সহকারী কর্মকর্তা তাঁকে জানান, গত ৫০ বছর জমিটির খাজনা পরিশোধ করা হয়নি। এ জন্য খাজনা এসেছে ১৪ হাজার টাকা। পরে অনেক অনুরোধের পর ৯ হাজার টাকা খাজনা কেটে দেওয়া হয়।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন লিপন আহমেদ। তাঁর বাবার নামে থাকা একটি পরচায় ৬৯ শতক জমি রয়েছে। এর মধ্যে লিপন ৯ শতক জমির মালিক। ব্যাংক থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণের আবেদনের জন্য জমির খাজনা পরিশোধের রসিদ প্রয়োজন হওয়ায় তিনি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যান।
সেখানে তাঁকে বলা হয়, পুরো পরচার সব জমির খাজনা পরিশোধ করতে হবে। কম্পিউটারে তথ্য যাচাই করে ২২ হাজার টাকা খাজনা দিতে হবে বলে জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। পরে কিছু টাকা ঘুষ দেওয়ার পর ১৪ হাজার ৮১৮ টাকার খাজনার রসিদ দেওয়া হয়।
শুধু রাজনগর নয়, মৌলভীবাজারের বিভিন্ন উপজেলার ইউনিয়ন ভূমি অফিসে এমন অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জমির খাজনা পরিশোধ থেকে শুরু করে নামজারি ও মিস কেস—প্রায় সব ধরনের সেবা নিতে গিয়েই তাঁদের ঘুষ ও হয়রানির মুখে পড়তে হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গ্রামাঞ্চলের অনেক মানুষ এখনো অনলাইনে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা পরিশোধের বিষয়ে দক্ষ নন। ফলে কোনো প্রয়োজনে খাজনা দিতে হলে তাঁদের ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যেতে হয়। আর এই সুযোগে অনেক ক্ষেত্রে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রথমে অনলাইনে জমির তথ্য যাচাই করে ৫০ বছরের বকেয়া খাজনা পরিশোধের কথা বলা হয়। অনেক ক্ষেত্রে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে খাজনার পরিমাণ বাড়িয়ে দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। পরে ঘুষ দিলে কখনো জমির শ্রেণি সংশোধন করা হয়, আবার কখনো ৫০ বছরের পরিবর্তে কয়েক বছরের খাজনা হিসাব করে রসিদ দেওয়া হয়।
সরেজমিনে রাজনগর, কমলগঞ্জ, কুলাউড়াসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিয়ন ভূমি অফিস ঘুরে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, জমির নামজারির জন্য সরকার নির্ধারিত ফি ১ হাজার ১০০ টাকা হলেও অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত টাকা ছাড়া ফাইল নড়তে চায় না। এমনকি কোনো তথ্য জানতে গেলেও অফিসের পিয়নকে ১০০ থেকে ২০০ টাকা দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে এক দিনের কাজেও নানা ত্রুটি দেখিয়ে পাঁচ-ছয় দিন পর্যন্ত ঘোরানোর অভিযোগ করেছেন অনেকে। তাঁদের ভাষ্য, নামজারি ও মিস কেসের ক্ষেত্রে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত চুক্তি হয়। কোনো জটিলতা থাকলে ঘুষের অঙ্ক ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্তও পৌঁছায়।
ভূমি অফিসের তহশিলদার, অফিস সহকারী, কানুনগো, সার্ভেয়ার, জারিকারক, পিয়ন ও দালালদের একটি অংশ এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন সেবাগ্রহীতারা।
এম এ ইসলাম নামের এক ভুক্তভোগী বলেন, ‘আমার জমির খাজনা ১৯ হাজার টাকা এসেছে বলে জানালেন তহশিলদার। পরে আমি তাঁকে ৯ হাজার টাকা দিয়েছি। তিনি অনলাইনে ৫ হাজার টাকার রসিদ কেটে দিয়েছেন।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মৌলভীবাজারের এক সাব-রেজিস্ট্রার বলেন, তাঁর পরিচিত একজন জমির খাজনা পরিশোধের জন্য অনলাইনে আবেদন করেছিলেন। প্রথমে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার টাকা পরিশোধের কপি দেওয়া হয়। পরে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে যোগাযোগ করলে সেটিকে ভুল হিসেবে সংশোধন করে মাত্র ৪০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদের সরকারি নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তাঁর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মো. জাহিদুল ইসলাম এসব বিষয়ে মন্ত্রী বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন। লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোসা. শাহীনা আক্তার বলেন, ‘আমাদের ভূমি অফিসে অনিয়ম-দুর্নীতি বা ঘুষ-বাণিজ্যের অভিযোগের প্রমাণসহ দিলে সঙ্গে সঙ্গে ওই ব্যক্তি বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, অনেকেই খাজনা পরিশোধের সময় জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ করেছেন। তবে এখন পর্যন্ত কেউ লিখিত অভিযোগ করেননি।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.