নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা, ভেসে গেছে গ্রাম-সড়ক-সেতু
হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী রাসুয়া জেলায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে। বুধবার ভোরে আঘাত হানা এই বন্যায় কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কায় সতর্কতা জারি করেছে স্থানীয় প্রশাসন।
রাসুয়া জেলার পাহাড়ি এলাকার শ্যাফ্রুবেসি ও তিমুরে বন্যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে। প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বসবাসের এই অঞ্চলে বিশেষ করে ভোতে কোশি নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ ও উঁচু এলাকায় সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
কাঠমান্ডুর উত্তরে অবস্থিত রাসুয়া জেলার একদিকে হিমালয়ের তিব্বত অঞ্চল, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে নেপালের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যপথ। ফলে বন্যায় স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি দুই দেশের বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, তিব্বত থেকে নেপালে প্রবাহিত ভোতে কোশি নদীতে জমে থাকা বরফ বা তুষার গলে যাওয়ার কারণে এ আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হতে পারে। তবে বন্যার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। জেলার ভাটির দিকে থাকা কয়েকটি এলাকাকেও উচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে।
রাসুয়ার প্রধান জেলা কর্মকর্তা নরেন্দ্র পারিয়ার জানিয়েছেন, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ব্যাপক হতে পারে। তবে পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার না হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
এখন পর্যন্ত ১২ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার ও অনুসন্ধান অভিযান চলছে। কাঠমান্ডুভিত্তিক এক চীনা ব্যবসায়ী ইয়ে লিয়াং জানিয়েছেন, তাঁর প্রতিষ্ঠানের সাতটি কনটেইনার ট্রাক ওই এলাকায় ছিল। ট্রাকগুলোতে কর্মরত নেপালি শ্রমিকদের সঙ্গে বন্যার পর থেকে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, ওই এলাকায় কোনো আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি জানেন না। বর্ষাকালে সেখানে কাদাধস ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটলেও এবারের বন্যা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি ভয়াবহ বলে মনে হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক নরেন্দ্র পারিয়ার জানিয়েছেন, বেশ কয়েকটি গ্রাম এবং বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পের এলাকা পানিতে ভেসে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের সংখ্যা বা সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে বড় ধরনের প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
ভোতে কোশি নদীতে আকস্মিক বন্যার কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। তবে গত বছরও একই নদীতে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। পরে জানা যায়, তিব্বতের একটি হিমবাহ-হ্রদের পানি হঠাৎ বেরিয়ে যাওয়ার কারণে ওই বন্যার সৃষ্টি হয়েছিল।
নেপালের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এবারের বন্যায় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সড়ক ও সেতুরও ক্ষতি হয়েছে। এর ফলে ওই এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জানিয়েছেন, দুর্গত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণকর্মীদের পাশাপাশি পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের পাঠানো হয়েছে। নিচু এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নদীর আশপাশের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ভোতে কোশি নদীর উৎপত্তি তিব্বতে। পরে এটি নেপালের ত্রিশূলী নদীতে গিয়ে মিশেছে। ত্রিশূলী নদী ভারতের ভূখণ্ডে প্রবেশের পর গণ্ডক নদী নামে প্রবাহিত হয়েছে।
গত বছর ভোতে কোশি নদীর বন্যায় অন্তত ৯ জন নিহত ও ২৪ জন নিখোঁজ হন। ওই বন্যায় নেপাল-চীন সংযোগকারী ‘ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ’ও ভেসে যায়। এতে কয়েক মাস ধরে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও পরিবহন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল।
আঞ্চলিক জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের বন্যার পেছনেও তিব্বতের একটি সুপ্রাগ্লেশিয়াল হ্রদের পানি হঠাৎ বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা দায়ী ছিল। সুপ্রাগ্লেশিয়াল হ্রদ বলতে হিমবাহের ওপর বা পৃষ্ঠদেশে জমে থাকা তরল পানির জলাশয়কে বোঝায়।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.