তাড়াহুড়ো নয়, উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলে ভারত সফর: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

প্রকাশিত: ২০ আগস্ট, ২০২৬ ১০:৫৮ (বৃহস্পতিবার)
তাড়াহুড়ো নয়, উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলে ভারত সফর: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

 

দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান, কূটনৈতিক আলোচনা এবং সম্মানজনক আমন্ত্রণের মাধ্যমে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর হতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।

তিনি বলেন, আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আগে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে নানা আলোচনা থাকলেও বাংলাদেশ এ বিষয়ে কোনো তাড়াহুড়ো করতে চায় না। জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দুই দেশের মধ্যে ঐকমত্যের ভিত্তিতে পরিবেশ তৈরি হলে ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের বিষয়ে ঢাকা ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

সোমবার (১৭ আগস্ট) দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন হুমায়ুন কবির। সাক্ষাৎকারে তিনি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, চীন, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার এবং সরকারের পররাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।

ভারত সফর নিয়ে গণমাধ্যমের খবর ‘অনুমাননির্ভর’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন খবরকে অনুমাননির্ভর বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।

তিনি বলেন, দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও সরকারপ্রধান পর্যায়ের সফরের বিষয়টি নির্ভর করছে ভারতের বর্তমান নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থানের ওপর। একই সঙ্গে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বাস্তবতাকে ভারতকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে হবে।

হুমায়ুন কবিরের ভাষ্য, বাংলাদেশের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের ম্যান্ডেট নিয়ে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে ভারত কী ধরনের সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়, সেটি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। জাতীয় স্বার্থের বাইরে গিয়ে দ্রুত শীর্ষ পর্যায়ের সফরের কোনো প্রয়োজন নেই।

বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতা নিয়ে ক্ষোভ

ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বা প্রচারমূলক কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ দেওয়ার বিষয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ভারতের মাটিতে রাজনৈতিক বা গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া নিয়ে সরকার অসন্তুষ্ট। তাঁর দাবি, ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যেকোনো অস্থিতিশীল কর্মকাণ্ড বন্ধে নয়াদিল্লির সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিতে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি

সরকারের পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা হচ্ছে।

সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রিয়াদ সফরও শিগগিরই চূড়ান্ত হতে পারে বলে জানান তিনি।

পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ চলছে বলেও জানান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।

যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার

অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান হুমায়ুন কবির।

যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ও বেসরকারি খাতের সঙ্গে সয়াবিন আমদানি, বোয়িং বিমান ক্রয় এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ট্রেড অ্যান্ড পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট নিয়ে সুনির্দিষ্ট আলোচনা শুরু হয়েছে।

চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নতুন অগ্রগতির কথা তুলে ধরেন তিনি। তাঁর দাবি, চীনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করার পাশাপাশি ‘টু প্লাস টু’ মেকানিজম ও কম্প্রিহেন্সিভ পার্টনারশিপের আওতায় সহযোগিতা বাড়ানো হচ্ছে। চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়েও আলোচনা চলছে।

এ ছাড়া যুক্তরাজ্যের সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটি ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির বিষয়েও কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

আফ্রিকার সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর উদ্যোগ

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আফ্রিকার ৫৪টি দেশের মধ্যে ৫২টি দেশের সমর্থন পাওয়ার বিষয়টিকে বাংলাদেশের প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।

তিনি জানান, আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করতে শিগগিরই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল ওই অঞ্চলে সফর করবে। সেখানে বাংলাদেশি পণ্যের নতুন বাজার তৈরি ও কন্ট্রাক্ট ফার্মিংসহ বিভিন্ন বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে।

শিগগির খুলতে পারে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার

দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়েও আশার কথা জানিয়েছেন হুমায়ুন কবির।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর ইতিবাচক মনোভাব এবং দ্বিপক্ষীয় আলোচনার কারণে জটিলতা কাটতে শুরু করেছে। খুব শিগগিরই বাংলাদেশি কর্মীদের মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পথ আবার উন্মুক্ত হতে পারে।

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কূটনৈতিক চাপ

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদে বাংলাদেশের নির্বাচিত হওয়ার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর কথা জানিয়েছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।

তিনি বলেন, মিয়ানমার, চীনসহ সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক অংশীদারদের ওপর প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও আর্থিক চাপ তৈরির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের জন্য একটি টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ সমাধান নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে।

হুমায়ুন কবিরের দাবি, সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে একটি সুসংগঠিত পররাষ্ট্রনীতি কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সাফল্য এবং সরকারের কূটনৈতিক উদ্যোগগুলো দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও সার্বভৌম মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখছে।

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোতাহার হোসেন

মোবাইল: ০১৩৩২-৮৪৫৬৯৯

তথ্য ও প্রযুক্তি সহযোগী - আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.