গ্যাস ও কাঁচামাল সংকটে বন্ধ ছয় সার কারখানা, আমনে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ
দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত সাতটি সার কারখানার মধ্যে ছয়টিই বর্তমানে উৎপাদনের বাইরে। গ্যাস সংকট, যান্ত্রিক ত্রুটি ও কাঁচামালের অভাবে এসব কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। একমাত্র ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানায় উৎপাদন অব্যাহত থাকলেও সামনে আমন ও রবি মৌসুমে সারের সরবরাহ নিয়ে কৃষক ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) অধীনে থাকা বন্ধ কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কোম্পানি (সিইউএফএল), যমুনা ফার্টিলাইজার (জেএফসিএল), আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি (এএফসিএল), ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি), ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি (ডিএপিএফসিএল) এবং শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি (এসএফসিএল)।
বিসিআইসির পরিচালক (বাণিজ্য) মো. মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, ছয়টি কারখানা বন্ধ থাকলেও আগামী এক-দুই দিনের মধ্যে শাহজালাল সার কারখানায় উৎপাদন পুনরায় শুরু হতে পারে। তাঁর দাবি, আমন মৌসুমে সারের ঘাটতি হবে না। কাতার ও সৌদি আরব থেকে বিকল্প পথে সার আমদানি করা হচ্ছে। পাশাপাশি রাশিয়া ও ব্রুনেই থেকেও সার আমদানির বিষয়ে আলোচনা চলছে।
বিসিআইসির সাতটি কারখানার সম্মিলিত দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার ১০০ টন। এর মধ্যে সিইউএফএল গত ফেব্রুয়ারি থেকে গ্যাস সংকটে বন্ধ রয়েছে। কারখানাটিতে প্রতিদিন ১১০০ থেকে ১২০০ টন ইউরিয়া উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী মাসের শুরুতে এটি চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
একই কারণে গত ফেব্রুয়ারি থেকে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে যমুনা ফার্টিলাইজার কারখানায়। কারখানাটিতে দৈনিক প্রায় ১২০০ থেকে ১৩০০ টন ইউরিয়া উৎপাদন করা সম্ভব। আশুগঞ্জ সার কারখানাও গত বছরের ১ মার্চ থেকে গ্যাস সংকটে বন্ধ। এখানে দৈনিক প্রায় ১১০০ টন সার উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। উৎপাদন বন্ধ থাকায় প্রতি মাসে প্রায় ১৩৫ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
অন্যদিকে কাঁচামালের সংকটে গত বছরের নভেম্বর থেকে বন্ধ টিএসপি কারখানা। এখানে দৈনিক ২০০ থেকে ৩০০ টন সার উৎপাদন করা যায়। ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানির উৎপাদনও গত ২৮ জুন থেকে বন্ধ রয়েছে। ফসফরিক অ্যাসিডের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
শাহজালাল ফার্টিলাইজার কারখানায় দৈনিক প্রায় ১৩০০ টন উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। কর্তৃপক্ষ আশা করছে, খুব শিগগিরই কারখানাটিতে উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে।
বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলোর মধ্যে শুধু ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানায় উৎপাদন চলছে। এ কারখানায় দৈনিক ২৮০০ টনের বেশি সার উৎপাদন হচ্ছে।
চাহিদার তুলনায় মজুত কম
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সারের মজুত রয়েছে যথাক্রমে ৫ লাখ ৬৮ হাজার, ৩ লাখ ৫২ হাজার, ৩ লাখ ৬৮ হাজার ও ১ লাখ ৮১ হাজার টন। তবে আসন্ন রবি মৌসুমের চাহিদার তুলনায় এসব মজুত এখনো কম।
রবি মৌসুমে ইউরিয়ার চাহিদা ১৩ লাখ ২৬ হাজার টন, ডিএপির ৯ লাখ ৮৮ হাজার টন, টিএসপির ৪ লাখ ৪৯ হাজার টন এবং এমওপির চাহিদা ৫ লাখ ৯৮ হাজার টন।
তবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের দাবি, আমদানি করা সার দেশে পৌঁছালে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। চলতি মাসেই কানাডা, রাশিয়া ও মরক্কো থেকে আরও সার দেশে আসার কথা রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মৌসুম শুরুর আগেই চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত সার মজুত নিশ্চিত করা হবে।
আমদানি নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে সার আমদানির ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার এড়িয়ে বিকল্প রুটে সার আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরাও।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলমের মতে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশে সার উৎপাদন বাড়ানো জরুরি। তাঁর পরামর্শ, বন্ধ থাকা বিসিআইসির কারখানাগুলো দ্রুত সচল করে আমদানিনির্ভরতা কমাতে হবে।
কৃষকের মধ্যে উদ্বেগ
এদিকে মাঠপর্যায়ে সারের সরবরাহ নিয়ে ইতোমধ্যে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। রংপুরের কয়েকজন কৃষক জানিয়েছেন, স্থানীয় বাজারে প্রয়োজনীয় সার একসঙ্গে পাওয়া যাচ্ছে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক ধরনের সার পাওয়া গেলেও অন্য ধরনের সার সংকট দেখা দিচ্ছে। আবার কিছু দোকানে বেশি দাম চাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
কৃষকদের আশঙ্কা, আমন চাষের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রয়োজনীয় সার সময়মতো না পাওয়া গেলে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে।
তবে কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, সার সরবরাহ ও বাজার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। দেশের ৬৪ জেলায় ৬৪ জন ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, আমন ও পরবর্তী রবি মৌসুমে কৃষকদের কাছে প্রয়োজনীয় সার নিশ্চিত করা।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.