রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল: রাজপথের দীর্ঘ সংগ্রাম থেকে বঙ্গভবনের পথে

প্রকাশিত: ১৩ আগস্ট, ২০২৬ ১৭:১০ (শুক্রবার)
রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল: রাজপথের দীর্ঘ সংগ্রাম থেকে বঙ্গভবনের পথে

ঢাকা: বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের প্রার্থী হিসেবে দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম ঘোষণা করেছে। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর নাম রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে প্রস্তাব করেন। পরে বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে তা অনুমোদিত হয়।

আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে দলটির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুলের নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।

রাষ্ট্রপতি পদে তাঁর মনোনয়ন মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে শিক্ষকতা, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং পরে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব—বিভিন্ন পর্যায় পেরিয়ে এবার তিনি দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদগুলোর একটির জন্য দলীয় মনোনয়ন পেলেন।

ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম, রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে ওঠা

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে। তাঁর বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী এবং রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তাঁর মা ছিলেন মির্জা ফাতেমা আমিন।

পারিবারিকভাবেও রাজনীতির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তাঁর চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা, সাবেক মন্ত্রী এবং জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার। আরেক চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকারের ডাইরেক্টোরেট অব ইয়ুথ ক্যাম্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করার পর মির্জা ফখরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করেন এবং স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

ছাত্ররাজনীতি থেকে শিক্ষকতা

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই তিনি সক্রিয় ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি এসএম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭২ সালে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেন মির্জা ফখরুল। এরপর ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন সরকারি কলেজে অর্থনীতি বিষয়ে শিক্ষকতা করেন। পাশাপাশি সরকারি একটি অধিদপ্তরে নিরীক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৯ সালে তিনি তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব নেন। এরশাদ সরকারের সময় ওই দায়িত্ব থেকে সরে গিয়ে আবার শিক্ষকতায় ফিরে যান। পরে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেন।

স্থানীয় রাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতিতে

১৯৮৬ সালে শিক্ষকতা ছেড়ে স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হন মির্জা ফখরুল। ১৯৮৮ সালের পৌরসভা নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি।

এরপর এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি কৃষকদলের সহসভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও জয় পাননি। অবশেষে ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী রমেশ চন্দ্র সেনকে পরাজিত করে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মন্ত্রিসভায় তিনি প্রথমে কৃষি প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

বিএনপির মহাসচিব

২০০৯ সালে বিএনপির জাতীয় সম্মেলনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর তিনি বিএনপির অন্যতম প্রধান মুখপাত্র হিসেবে পরিচিতি পান।

২০১১ সালে দলের তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলওয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর খালেদা জিয়া তাঁকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেন। দীর্ঘদিন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ২০১৬ সালের জাতীয় সম্মেলনে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির মহাসচিব নির্বাচিত হন।

দলের নেতৃত্বে থাকার সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দাবিতে আন্দোলন কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন তিনি। বিরোধী দলের রাজনীতিতে বিএনপির অন্যতম প্রধান সংগঠক ও মুখপাত্র হিসেবে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

মামলা, গ্রেপ্তার ও কারাবাস

মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের একটি বড় অংশ কেটেছে মামলা, গ্রেপ্তার ও কারাবাসের মধ্য দিয়ে। বিএনপির পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে দাবি করা হয়েছে, রাজনৈতিক কারণে তাঁর বিরুদ্ধে বিপুলসংখ্যক মামলা দেওয়া হয়েছে।

বিভিন্ন সময় তাঁকে গাড়ি ভাঙচুর, পুলিশের কাজে বাধা, নাশকতা ও বোমাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে করা মামলায় গ্রেপ্তার হতে হয়েছে। ২০১২ থেকে ২০১৫ সালের রাজনৈতিক আন্দোলনের সময় একাধিকবার কারাবন্দি ছিলেন তিনি।

২০১৬ সালে বিএনপির পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হওয়ার পরও তাঁকে পুরোনো মামলায় কারাগারে যেতে হয়। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশের আগে তাঁর গ্রেপ্তার এবং ২০২৩ সালের অক্টোবরের রাজনৈতিক কর্মসূচির পর গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকার ঘটনাও আলোচিত হয়।

শারীরিক নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছেন। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে একাধিকবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাধা ও হামলার মুখেও পড়েছেন।

এবার রাষ্ট্রপতি ভবনের পথে

দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার পর এবার মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করেছে তাঁর দল।

রাজনীতির মাঠে দীর্ঘদিন বিরোধী দলের নেতৃত্ব দেওয়া এই প্রবীণ নেতা এবার দেশের সাংবিধানিক সর্বোচ্চ পদে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে। ২০ আগস্টের নির্বাচনেই নির্ধারিত হবে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের নতুন অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক সূচনা।

একসময় রাজপথের আন্দোলন, মামলা ও কারাবাসে যাঁর রাজনৈতিক জীবনের বড় একটি সময় কেটেছে, সেই মির্জা ফখরুল এখন রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির এক নতুন পর্বের সামনে দাঁড়িয়ে।

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোতাহার হোসেন

মোবাইল: ০১৩৩২-৮৪৫৬৯৯

তথ্য ও প্রযুক্তি সহযোগী - আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.