পরিকল্পনার দুর্বলতায় থমকে এনএসইজেডের পানি প্রকল্প
চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে গড়ে ওঠা জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে (এনএসইজেড) শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে ২০১৯ সালে শুরু হয়েছিল ‘জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে পানি শোধনাগার ও গভীর নলকূপ স্থাপন’ প্রকল্প। তিন বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার লক্ষ্য থাকলেও প্রায় সাত বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটির অর্ধেক কাজও সম্পন্ন হয়নি। এরই মধ্যে প্রকল্প ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১২৯ কোটি টাকা। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু বাহ্যিক প্রতিবন্ধকতাই নয়, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও এ বিলম্বের অন্যতম কারণ।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ২০১৯ সালের জুলাইয়ে প্রকল্পটির কাজ শুরু করে। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২২ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। পরে এক দফা সময় বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। সম্প্রতি প্রকল্প পরিচালনা কমিটি (পিএসসি) আবারও সময় বাড়িয়ে ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত নেওয়ার সুপারিশ করেছে। ফলে তিন বছরের প্রকল্প শেষ হতে সময় লাগছে প্রায় সাত বছর।
সময়ের পাশাপাশি ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মূল ডিপিপিতে প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৬৩২ কোটি ৮২ লাখ টাকা। সংশোধিত ডিপিপিতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৬১ কোটি ৯৬ লাখ টাকায়। অর্থাৎ অতিরিক্ত ব্যয় যোগ হয়েছে প্রায় ১২৯ কোটি টাকা। অথচ চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৫১ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৪০ দশমিক ৮ শতাংশ।
আইএমইডির প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি অবকাঠামো—প্রতিদিন ৫০ মিলিয়ন লিটার সক্ষমতার সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট এবং প্রায় ১০ কিলোমিটার ট্রান্সমিশন পাইপলাইন—সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে রয়েছে। পানি শোধনাগারের কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ৫৫ শতাংশ এবং পাইপলাইন নির্মাণের অগ্রগতি ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
অন্যদিকে তুলনামূলক সহজ কাজগুলো প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। ২৩টি গভীর নলকূপ, পাম্প হাউস ও বিতরণ নেটওয়ার্কের কাজের অগ্রগতি ৯৪ শতাংশ। এছাড়া ভূমি অধিগ্রহণ, ভূমি উন্নয়ন, সড়ক ও সেতু নির্মাণের কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর বাস্তবায়ন কেন পিছিয়ে পড়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রতিবেদনে বিলম্বের কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক দরপত্র প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা, কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব, বিদেশ থেকে যন্ত্রপাতি আমদানিতে বিলম্ব এবং বর্ষাকালে কাজ ব্যাহত হওয়ার বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আইএমইডি মনে করছে, প্রকল্প পরিকল্পনা, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং বাস্তবায়ন ব্যবস্থাপনায় ঘাটতিও এ দীর্ঘসূত্রতার জন্য দায়ী। বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ঝুঁকি আগেই বিবেচনায় এনে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত ছিল।
সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, দুর্বল সমীক্ষা ও বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতার কারণে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ করা সম্ভব হয়নি। এতে যেমন সরকারি ব্যয় বেড়েছে, তেমনি প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যও এখনো পূরণ হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিলম্বের প্রভাব শুধু প্রকল্পেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এনএসইজেডে শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালুর জন্য নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পানি অবকাঠামো প্রস্তুত না হলে নতুন শিল্পকারখানা চালু বিলম্বিত হবে, বিনিয়োগ আটকে থাকবে, উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
আইএমইডি প্রতিবেদনে নিরাপত্তা ও পরিবেশগত বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে। তিনটি পাম্প হাউসে চুরির ঘটনার পর নিরাপত্তা জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিনির্ভরশীলতা কমাতে কৃত্রিম পুনর্ভরণ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং দ্রুত পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নীতিমালা প্রণয়নের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি জানিয়েছেন, প্রকল্পটি দ্রুত শেষ করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে। পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নে যেসব দুর্বলতা রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আইএমইডির মূল্যায়ন অনুযায়ী, সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দেশের সবচেয়ে বড় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্পায়নের গতি আরও ধীর হয়ে পড়তে পারে এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.