বড় ঋণেই বাড়ছে খেলাপির বোঝা, ব্যাংক খাতে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতারা
দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের বড় অংশই এখন উচ্চমূল্যের ঋণকে ঘিরে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণের ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ বর্তমানে খেলাপি। অন্যদিকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে খেলাপির হার মাত্র ১৫ শতাংশ, যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই চিত্র শুধু ব্যবসায়িক ঝুঁকির প্রতিফলন নয়; বরং দীর্ঘদিনের দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক প্রভাব, সুশাসনের ঘাটতি এবং জবাবদিহির অভাবের ফলাফল।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সাধারণত বেশি সুদে ঋণ নিলেও ব্যবসা সচল রাখতে সময়মতো ঋণ পরিশোধের চেষ্টা করেন। কিন্তু বড় ঋণগ্রহীতাদের অনেকেই কম সুদের সুবিধা নিয়েও ঋণ পরিশোধে অনীহা দেখান। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা পুনঃতফসিল, ঋণ পুনর্গঠন বা বিশেষ সুবিধাও পেয়ে থাকেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে. মুজেরী বলেন, বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণ ব্যাংকের জন্য তুলনামূলকভাবে সহজ এবং পরিচালন ব্যয়ও কম। তবে বড় ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে খেলাপির প্রবণতা বাড়তে থাকায় ব্যাংকিং খাতে একটি নেতিবাচক ঋণ সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে। তাঁর মতে, প্রভাবশালী গ্রাহকরা নানা উপায়ে দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পান। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি আরও কার্যকর এবং ব্যাংকগুলোর ঋণ ব্যবস্থাপনা আরও পেশাদার হওয়া জরুরি।
তিনি আরও বলেন, প্রকৃত খেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের পরিবর্তে অনেক সময় ঋণ রাইট-অফ বা পুনঃতফসিলের ওপর বেশি নির্ভর করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান করছে না। দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনাই হবে কার্যকর পথ।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চে ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণের খেলাপির হার ছিল ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে ২০২৬ সালের মার্চে ৪২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে এ ধরনের ঋণের মোট স্থিতিও ৫ লাখ ২০ হাজার ৪০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৫ লাখ ৭৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ ঋণের পরিমাণ যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে খেলাপির ঝুঁকিও।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ঋণের অঙ্ক যত বড়, খেলাপির হারও তত বেশি। ১০ থেকে ২০ কোটি টাকার ঋণে খেলাপির হার সর্বোচ্চ ৪৫ দশমিক ১ শতাংশ। এছাড়া ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকার ঋণে এ হার ৪৪ দশমিক ৭ শতাংশ, ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকায় ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ, ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকায় ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ১ থেকে ১০ কোটি টাকার ঋণে ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতে বড় ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে অনেক সময় পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই ছাড়াই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং অপর্যাপ্ত তদারকির কারণে বিতরণ করা এসব ঋণের বড় অংশ পরে আদায় করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর রিয়াজ বলেন, অনেক ব্যাংকের বর্তমান আর্থিক অবস্থাই প্রমাণ করে যে বড় ঋণ দেওয়ার আগে গ্রাহকের প্রকৃত পরিশোধ সক্ষমতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। তাঁর মতে, ভবিষ্যতে বড় ঋণ অনুমোদনের সময় নগদ প্রবাহ, প্রকল্পের বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা এবং ঝুঁকি বিশ্লেষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
মুস্তফা কে. মুজেরী আরও বলেন, ছোট ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নিলেও বড় ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে একই কঠোরতা অনেক সময় দেখা যায় না। এর প্রভাব পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর পড়ে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চে মোট খেলাপি ঋণের হার ছিল ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ। একই বছরের ডিসেম্বর তা বেড়ে ৩১ দশমিক ২ শতাংশ এবং ২০২৬ সালের মার্চে ৩২ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছায়।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারাই অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উৎপাদন সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তাই তাঁরা ঋণ পরিশোধে অধিক দায়িত্বশীল। বিপরীতে বড় ঋণগ্রহীতাদের একটি অংশের মধ্যে ঋণ ফেরত না দেওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এ কারণে বর্তমানে অনেক ব্যাংক বড় ঋণের পরিবর্তে ছোট ও মাঝারি ঋণ বিতরণে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.