নকশার ত্রুটি ও অনিয়মে ধীরগতিতে সাসেক ঢাকা–সিলেট করিডর প্রকল্প

প্রকাশিত: ০২ জুলাই, ২০২৬ ১২:০৯ (শুক্রবার)
নকশার ত্রুটি ও অনিয়মে ধীরগতিতে সাসেক ঢাকা–সিলেট করিডর প্রকল্প

প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের সাসেক ঢাকা–সিলেট করিডর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প শুরু থেকেই নানা সমস্যায় পড়েছে। মূল নকশার ভুল, জমি অধিগ্রহণে বিলম্ব, ইউটিলিটি লাইন স্থানান্তরের ধীরগতি এবং সংশোধিত নকশার অনুমোদন না হওয়ায় প্রকল্পের কাজ পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছে না। ফলে প্রকল্পের সময় ও ব্যয় উভয়ই বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)-এর নিবিড় সমীক্ষায় আরও উঠে এসেছে, প্রকল্পে দরপত্র, বিল পরিশোধ, কর আদায় ও চুক্তি বাস্তবায়নে প্রায় ২৫০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম হয়েছে। এ বিষয়ে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

২০২১ সালে শুরু হওয়া ছয় বছর মেয়াদি প্রকল্পের প্রায় ৮৯ শতাংশ সময় শেষ হলেও ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ভৌত অগ্রগতি মাত্র ২১.৫ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ২৬.১৩ শতাংশ। এ পর্যন্ত প্রায় ৪,৪২২ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, যার বড় অংশই এডিবির ঋণ থেকে এসেছে। আইএমইডির মতে, বর্তমান অগ্রগতির ভিত্তিতে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ করা সম্ভব নয়।

প্রকল্প পরিচালক এ কে এম ফজলুল করিম জানান, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও বাস্তবায়নের মধ্যে কিছু অসামঞ্জস্য ধরা পড়েছে। প্রাথমিক ভূতাত্ত্বিক জরিপে দুর্বল মাটি ও কাদার বিষয়টি ধরা না পড়ায় পরে নকশা পরিবর্তন ও ভূমি উন্নয়নের প্রয়োজন হয়েছে, যা কাজে বিলম্ব ঘটিয়েছে।

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় ৮২৯.৮৩ একর জমির মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ৩১২.১৫ একর অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। একইভাবে ১৯০.২৫ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ঠিকাদারদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে মাত্র ৯১.২২ কিলোমিটার।

ইউটিলিটি স্থানান্তরের কাজও খুব ধীরগতিতে চলছে। বিদ্যুতের লাইন স্থানান্তরের অগ্রগতি প্রায় ৪৬ শতাংশ হলেও তিতাস গ্যাসের ক্ষেত্রে মাত্র ০.৭৮ শতাংশ এবং জালালাবাদ গ্যাসের ক্ষেত্রে ১৫.৬৮ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে অনেক জায়গায় ঠিকাদারেরা কাজের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা পাচ্ছেন না।

নির্মাণ অগ্রগতিতেও বড় ধরনের পিছিয়ে রয়েছে প্রকল্প। মূল সড়কের কাজ হয়েছে মাত্র ১১.৫ শতাংশ। সার্ভিস লেন, সেতু ও কালভার্টের কাজও প্রত্যাশার তুলনায় কম। অন্যদিকে ইউ-টার্ন, রাউন্ডঅ্যাবাউট ও ফুটওভারব্রিজের কাজ এখনো শুরু হয়নি।

সরকারি নিরীক্ষায় দেখা গেছে, সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতার সঙ্গে চুক্তি, অতিরিক্ত বিল পরিশোধ, ভ্যাট-কর আদায়ে অনিয়মসহ বিভিন্ন কারণে প্রায় ২৫০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম হয়েছে। এছাড়া কাজ না করেই বিল পরিশোধ, অনুমোদন ছাড়া অতিরিক্ত ব্যয়, সরকারি কোষাগারে ব্যাংক সুদ জমা না দেওয়া এবং বাধ্যতামূলক বিমা না করার মতো অভিযোগও পাওয়া গেছে।

আইএমইডি নির্মাণকাজের মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। কিছু স্থানে কংক্রিটের মান নকশার নির্ধারিত মানের চেয়ে কম পাওয়া গেছে। পাশাপাশি শ্রমিকদের নিরাপত্তা সরঞ্জামের ব্যবহার, নিরাপত্তা বেষ্টনী ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থায়ও ঘাটতি রয়েছে।

নির্মাণকাজের কারণে স্থানীয় মানুষের ভোগান্তিও বেড়েছে। সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রায় ৮৯ শতাংশ মানুষ ধুলা, শব্দ, নির্মাণবর্জ্য ও পানি নিষ্কাশন সমস্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এছাড়া অধিকাংশ জমির মালিক এখনো ক্ষতিপূরণ পাননি এবং যাঁরা পেয়েছেন, তাঁদের অনেকেই ক্ষতিপূরণকে ন্যায্য মনে করছেন না।

এডিবির কর্মকর্তাদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রধান বাধা হলো জমি অধিগ্রহণ, ইউটিলিটি স্থানান্তর, নকশা পরিবর্তন এবং দুর্বল ঠিকাদারি কার্যক্রম। আইএমইডির সুপারিশ অনুযায়ী, দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ, জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন, ইউটিলিটি স্থানান্তর, ঠিকাদারদের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নির্মাণের গুণগত মান নিশ্চিত করা না গেলে প্রকল্পের সময় ও ব্যয় আরও বাড়বে। তবে এসব সমস্যা দ্রুত সমাধান করা গেলে প্রকল্পটি প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনতে পারে।

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোতাহার হোসেন

মোবাইল: ০১৩৩২-৮৪৫৬৯৯

তথ্য ও প্রযুক্তি সহযোগী - আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.