ব্যয় বাড়ায় সংকটে চা-শিল্প
প্রায় ১৭০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশের চা-শিল্প এখন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে চা উৎপাদন বাড়লেও লাগামহীন উৎপাদন ব্যয় শিল্পটিকে চাপে ফেলেছে। তেল, সার, কীটনাশক ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি শ্রমিক মজুরি বেড়ে যাওয়ায় অনেক বাগান উৎপাদন খরচই তুলতে হিমশিম খাচ্ছে। অন্যদিকে শ্রমিকদের অভিযোগ, বর্তমান মজুরিতে তাদের জীবনযাপনও কষ্টকর হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে চা চাষের যাত্রা শুরু হয় ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনীছড়া চা-বাগানে। এরপর ধীরে ধীরে দেশে গড়ে ওঠে ১৬৮টি চা-বাগান। দীর্ঘ এই পথচলায় উৎপাদন বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যয় বৃদ্ধির চাপ শিল্পটিকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
২০২২ সালের শ্রমিক আন্দোলনের পর চা-শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৭০ টাকা করা হয়। এর পরপরই জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়। একই সঙ্গে সার, কীটনাশক ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচ আরও বাড়তে থাকে।
চাতলাপুর চা-বাগানের ব্যবস্থাপক শুভঙ্কর চন্দ্র নাথ বলেন, উৎপাদন বাড়লেও অধিকাংশ চা-বাগান আর্থিকভাবে স্বস্তিতে নেই। কারণ, উৎপাদন ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, তাতে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে শ্রমিকদের দাবি, বর্তমানে তারা দৈনিক ১৭৮ টাকা ৫০ পয়সা মজুরি পেলেও তা জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাদের মতে, চুক্তি অনুযায়ী প্রতি বছর ৫ শতাংশ হারে মজুরি বাড়ানোর কথা থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর হচ্ছে না।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরি বলেন, উৎপাদন বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু শ্রমিকদের প্রাপ্য মজুরি বৃদ্ধি পাচ্ছে না। ফলে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চায়ের নিলামমূল্য গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রতি কেজি চায়ের গড় মূল্য ছিল ১৭১ টাকা ২৪ পয়সা, ২০২৪-২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২০২ টাকা ৪৬ পয়সায়। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গড় মূল্য উঠেছে ২৪৫ টাকা ৫০ পয়সায়, যা গত এক দশকের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
তবে মালিকপক্ষের দাবি, বিক্রয়মূল্য বাড়লেও উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির কারণে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অনেক বাগান পরিচালনা করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, পোকামাকড় ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অনেক এলাকায় পানির সংকট—এসবই বর্তমানে চা-শিল্পের বড় চ্যালেঞ্জ। এসব সমস্যা মোকাবিলা করেই শিল্পটিকে টেকসইভাবে এগিয়ে নিতে হবে।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.