খরচের ঊর্ধ্বগতিতে নাভিশ্বাস জনজীবনে
সরকার এক ধাপে বিদ্যুতের দাম প্রায় ১৭ শতাংশ বাড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে গত দুই মাসে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম দুই দফা বৃদ্ধির পর এবার বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সংসার চালানোর খরচ বেড়ে যাওয়ার শঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন অনেকেই।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে কথা হয় বেসরকারি চাকরিজীবী মাহবুবুল হাসানের সঙ্গে। বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির খবর জেনে তিনি বলেন, “এমনিতেই নিত্যপণ্যের দাম অনেক বেশি। এখন বিদ্যুৎ বিলও বাড়বে। আমাদের বাসার মাসিক বিদ্যুৎ বিল প্রায় দুই হাজার টাকা আসে, এখন আরও ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি গুনতে হবে। এর সুযোগে ব্যবসায়ীরাও পণ্যের দাম বাড়াতে পারে।”
একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আরেক চাকরিজীবী শাহ আলম। তেজতুরী বাজারে আলাপকালে তিনি বলেন, “প্রচণ্ড গরমের কারণে আগামী মাসে একটি এসি কেনার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বিদ্যুতের দাম বাড়ায় সেই চিন্তা বাদ দিতে হচ্ছে। এখন সামনে হয়তো ফ্যানও হিসাব করে চালাতে হবে।”
জনজীবনে বাড়বে চাপ
কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। এর প্রভাবে দেশে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে। এলপিজির দামও কয়েক দফা সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যেই বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করবে।
তার মতে, ভর্তুকি কমানোর লক্ষ্যে ধাপে ধাপে ইউটিলিটি সেবার দাম বাড়ানো হলেও এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে। তিনি বলেন, “জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে অনিয়ম, অপচয় ও দুর্নীতি রোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন ছিল। দাম বাড়িয়ে সেই দায় জনগণের ওপর চাপানো ঠিক নয়।”
মিরপুরের বাসিন্দা রফিকুল ইসলামও একই প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, “জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর থেকেই বাজারে প্রায় সবকিছুর দাম বেড়েছে। কিন্তু মানুষের আয় তো বাড়েনি। তাহলে অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের দায়ও কি সাধারণ মানুষকেই বহন করতে হবে?”
উদ্বেগে শিল্প খাত
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ)। সংগঠনটির মতে, কোভিড-১৯ পরবর্তী সময় থেকে শিল্প খাত নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উচ্চ সুদহার, টাকার অবমূল্যায়ন, চলতি মূলধনের সংকট, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি, নির্মাণ খাতের মন্দা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা শিল্পের ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে।
বিএসএমএ জানিয়েছে, গত কয়েক বছরে বিদ্যুতের ট্যারিফ প্রায় ৩৬ শতাংশ, ডিমান্ড চার্জ ১২৫ শতাংশ এবং কিছু ক্ষেত্রে গ্যাসের মূল্য প্রায় ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এর মধ্যে নতুন করে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি শিল্প খাতের উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে।
সংগঠনটির আশঙ্কা, এতে শুধু উৎপাদন খরচই বাড়বে না, বরং দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাবে। নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে, কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিএসএমএর দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম কমলেও বিদ্যুতের ট্যারিফে তার প্রতিফলন দেখা যায় না। তাই শিল্প খাতের স্বার্থে বিদ্যুতের নতুন মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.